মশা নির্মূল করলে কী হবে?
প্রাণঘাতী শত্রুকে বিদায় দিলে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যে কী প্রভাব পড়বে
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ |১২ মে ২০২৬
মানুষের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক প্রাণী কোনটি? সিংহ, সাপ বা হাঙ্গর নয়—বরং ছোট্ট একটি মশা। প্রতি বছর মশাবাহিত রোগে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার—এসব রোগের একটি বড় অংশ মশার মাধ্যমে ছড়ায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশার বিস্তার আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে: সব মশা মেরে ফেললে কী হবে? পরিবেশের ক্ষতি হবে, নাকি মানুষের জন্য এটি আশীর্বাদ হবে?
শুধু ৫টি প্রজাতিই মূল সমস্যা
পৃথিবীতে প্রায় ৩,৫০০ প্রজাতির মশা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১০০ প্রজাতি মানুষের রক্ত খায়। আর এই ১০০টির মধ্যে মাত্র ৫টি প্রজাতি মানুষের মধ্যে ৯৫ শতাংশ রোগ সংক্রমণের জন্য দায়ী।
লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জীববিজ্ঞানী হিলারি র্যানসন বলেন, এই পাঁচটি প্রজাতি মূলত মানুষের আশেপাশে বাস করে এবং মানুষের রক্ত খেয়ে বংশবিস্তার করে। তাই এদের নির্মূল করলে পরিবেশব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা খুবই কম। অন্য কম ক্ষতিকর মশা প্রজাতি দ্রুত সেই জায়গা পূরণ করে নিতে পারবে।
জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড্যান পিচ বলেন, বেশিরভাগ মশা প্রজাতির পরিবেশগত ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও সীমিত। মশার লার্ভা পানিতে পুষ্টি ছড়ায়, অনেক মাছ, পোকা ও প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কাজ করে এবং কিছু প্রজাতি পরাগায়নে সাহায্য করে। তবে সব প্রজাতি একইভাবে এই কাজ করে না।
পরিবেশগত প্রভাব: বিতর্ক অব্যাহত
বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মশা সম্পূর্ণ নির্মূল করলে খাদ্যশৃঙ্খলে কিছু প্রভাব পড়তে পারে—বিশেষ করে পাখি, বাদুড়, মাছ ও ড্রাগনফ্লাইয়ের খাদ্যের একটি অংশ কমে যেতে পারে। আবার অনেকে মনে করেন, মশা কোনো প্রাণীর একমাত্র খাদ্য নয়। তাই এদের অনুপস্থিতিতে অন্য পোকা সেই জায়গা পূরণ করবে এবং বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কম।
র্যানসনের মতে, মানুষ ইতিমধ্যেই নানা কার্যকলাপের মাধ্যমে অনেক প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই শুধু এই পাঁচটি ক্ষতিকর প্রজাতি নির্মূল করা নৈতিকভাবেও যুক্তিযুক্ত হতে পারে।
নতুন প্রযুক্তি: জিনগত নিয়ন্ত্রণ ও ওলবাকিয়া
সম্পূর্ণ নির্মূলের পরিবর্তে বিজ্ঞানীরা এখন টার্গেটেড পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন:
জিন ড্রাইভ ও জিন এডিটিং: অ্যানোফিলিস মশাকে (ম্যালেরিয়া বাহক) প্রজননে অক্ষম করে দেওয়া বা ম্যালেরিয়া ভাইরাস ছড়াতে অক্ষম করা। ট্রান্সমিশন জিরো প্রকল্পের অধীনে এ নিয়ে গবেষণা চলছে এবং ২০৩০ সালে কোনো দেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া: এডিস ইজিপ্টাই মশাকে এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সংক্রমিত করা হয়। ফলে মশার সংখ্যা কমে এবং ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষমতা নষ্ট হয়।
ব্রাজিলের নিতেরই শহরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯ শতাংশ কমেছে। ব্রাজিলে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওলবাকিয়া মশা উৎপাদন কারখানা চালু হয়েছে, যা লাখ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, সমন্বিত সমাধান দরকার
হিলারি র্যানসন সতর্ক করে বলেন, কোনো একক ‘ম্যাজিক বুলেট’ নেই। রোগ মোকাবিলায় দরকার সমন্বিত কৌশল—ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা, দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত বাসস্থান, টিকা এবং ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মশাবাহিত রোগের বিরুদ্ধে অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে।
সর্বশেষ
মশা নির্মূল করা সম্ভব কি না—তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বিজ্ঞানীরা একমত যে, শুধু ক্ষতিকর কয়েকটি প্রজাতিকে লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রণ করলে মানুষের স্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটবে এবং পরিবেশের ওপর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
জিন প্রযুক্তি ও ওলবাকিয়ার মতো উদ্ভাবনী পদ্ধতি যদি সফল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মশাবাহিত রোগ থেকে মুক্ত একটি বিশ্বের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। তবে সফলতার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং সতর্কতার সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ।
সূত্র: হিলারি র্যানসন, ড্যান পিচ, ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রাম, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

0 মন্তব্যসমূহ