বিদ্যুৎ খাতে নতুন সংকট: আরইবির ‘লাভজনক’ সমিতির ওপর পিডিবির নজর, শঙ্কা গ্রামীণ বিদ্যুৎ কাঠামো ভাঙার
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৯ মে, ২০২৬
বাংলাদেশে গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এক গভীর সংকটের মুখে। নিজেদের আর্থিক ঘাটতি মেটাতে আরইবির অধীনে থাকা লাভজনক সমিতিগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সেগুলোর ওপর পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের বর্তমান ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকের ওপর মূল্যবৃদ্ধির বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্বন্দ্বের মূলে কী?
বর্তমানে আরইবির অধীনে ৮০টি সমিতি কাজ করছে। এর মধ্যে শিল্পাঞ্চলভিত্তিক মাত্র ১৩টি সমিতি মুনাফা করে, যার আয় দিয়ে বাকি ৬৩টি লোকসানি সমিতিকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। একে বলা হয় ‘ক্রস সাবসিডি’। পিডিবির দাবি, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয় আরইবির পেছনে। তাই ঘাটতি কমাতে পিডিবি চায় আরইবির ২১টি উচ্চ আয়ের সমিতিকে ঢাকার ডেসকো বা ডিপিডিসির মতো আলাদা কাঠামোয় এনে তাদের কাছে বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে।
পিডিবির যুক্তি ও প্রস্তাব:
ভর্তুকির বোঝা কমানো: পিডিবির মতে, আরইবিকে কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়ায় তাদের আর্থিক ঘাটতি বাড়ছে।
২১টি সমিতির আলাদা দাম: যেসব সমিতিতে বিল বেশি আসে (যেমন—শিল্পাঞ্চল), সেগুলোকে আলাদা ক্যাটাগরিতে ফেলে বেশি দামে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাব।
সরাসরি সংযোগ: বড় গ্রাহকদের ৩৩ কেভির পরিবর্তে ১৩২ কেভি থেকে সংযোগ দিলে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ২৪ পয়সা সাশ্রয় সম্ভব। এতে পিডিবির আয় বাড়বে।
গ্রামীণ বিদ্যুতায়নে বড় ঝুঁকির শঙ্কা
আরইবি কর্মকর্তারা বলছেন, পিডিবির এই প্রস্তাব আত্মঘাতী হতে পারে। তাদের মতে:
কাঠামো ভেঙে পড়বে: লাভজনক সমিতিগুলো থেকে নেওয়া ভর্তুকি বন্ধ হলে অধিকাংশ গ্রামীণ বিদ্যুৎ সমিতি দেউলিয়া হয়ে পড়বে।
দরিদ্র গ্রাহকের ওপর চাপ: আরইবির ৫৬ শতাংশ গ্রাহকই আবাসিক এবং দরিদ্র শ্রেণির। তাদের ভর্তুকি টিকিয়ে রাখতেই ক্রস সাবসিডি জরুরি।
খুচরা দাম বৃদ্ধির আবেদন: পাইকারি দাম বাড়লে আরইবি ইতোমধ্যে খুচরা পর্যায়ে ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। ফলে সরাসরি গ্রাহকের পকেট থেকেই বাড়তি খরচ যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের দায় চাপানো হচ্ছে’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম পিডিবির এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে বলেন:
"আরইবি চলে ক্রস সাবসিডি দিয়ে। মুনাফায় থাকা সমিতিগুলোই অন্য সমিতিকে বাঁচিয়ে রাখে। পিডিবি নিজেদের লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও অব্যবস্থাপনার দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপাচ্ছে। এই প্রস্তাব বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ খাতের সংকট শুধু আরইবির কারণে নয়, বরং কেন্দ্র ভাড়া ও অব্যবস্থাপনার ফলেই বাড়ছে।
এখন কী হবে?
আগামী ২০ ও ২১ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে পিডিবির এই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করা হবে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, অংশীজনদের বক্তব্য শুনে এবং ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনা করেই কমিশন তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি শেষ পর্যন্ত পিডিবির এই পথ অনুসরণ করে, তবে শহরাঞ্চলের বাইরে পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুতের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।

0 মন্তব্যসমূহ