এআইয়ের ল্যাবরেটরি হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপ: মাঠে নামছে থ্রিডি অ্যাভাটার, রোবট ও চালকহীন গাড়ি!
স্পোর্টস ও প্রযুক্তি ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১৮ মে, ২০২৬
আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই পর্দা উঠতে যাচ্ছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের। আগামী ১১ জুন মাঠের লড়াই শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টটি কেবল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসরই (৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ) হচ্ছে না, বরং এটি ফুটবলকে নিয়ে যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ নতুন যুগে। যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপটি এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের (AI) গভীর ছায়ায় ঢাকা পড়তে যাচ্ছে। ম্যাচের কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ও দর্শক পরিবহন—সবকিছুতেই এবার ব্যবহার হবে রিয়েল-টাইম ডেটা মডেল আর থ্রিডি সিমুলেশনের বিস্তৃত জগৎ।
চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক কীভাবে এআই পুরোপুরি বদলে দিতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপকে:
'ফুটবল এআই প্রো': ধনী-গরিব দলের ব্যবধান কমাবে প্রযুক্তি
এবারের বিশ্বকাপে প্রতিটি দল নিজেদের জন্য আলাদা একটি এআই মডেল পাবে। ‘ফুটবল এআই প্রো’ নামের এই বিশেষ প্রযুক্তিটির নির্মাতা ফিফার প্রযুক্তি অংশীদার লেনোভো।
কৌশল বিশ্লেষণ: এই প্রযুক্তিটি শত শত মিলিয়ন ফিফা ডেটা ঘেঁটে ২ হাজারের বেশি সূচক (যেমন—প্রেসিং, মুভমেন্ট, ট্যাকটিকস, আক্রমণ ও রক্ষণ বদল) নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে।
থ্রিডি অ্যাভাটার: ভিডিও ক্লিপ আর থ্রিডি অ্যাভাটারের মাধ্যমে এটি প্রতিপক্ষের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখাবে। কোচরা ম্যাচ শুরুর আগেই বুঝতে পারবেন, পরিকল্পনা বদলালে মাঠে তার সম্ভাব্য ফলাফল কেমন হতে পারে।
সমান সুযোগ: ব্যাংক অব আমেরিকা-এর গবেষণা বলছে, আগে যেখানে কেবল ধনী দলগুলো বিপুল অর্থ খরচ করে উচ্চমানের প্রযুক্তিগত সুবিধা পেত, এবার এআই সেই ব্যবধান কমিয়ে সব দলকে প্রায় একই সমান্তরালে দাঁড় করাবে।
মাত্র ১ সেকেন্ডে থ্রিডি স্ক্যান ও স্টেডিয়ামের ‘ডিজিটাল টুইন’
রেফারিংয়ের ভুলভ্রান্তি এড়াতে এবং অফসাইডের সিদ্ধান্তকে শতভাগ নিখুঁত করতে এবার মাঠে থাকছে অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি।
১ সেকেন্ডে স্ক্যান: মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের শরীর মাত্র এক সেকেন্ডে ডিজিটালি স্ক্যান করে তৈরি হবে নিখুঁত থ্রিডি প্রতিরূপ (Replica)। এর ফলে ভিএআর (VAR) বা অফসাইডের জটিল সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ দর্শকরাও সহজেই বুঝতে পারবেন।
ডিজিটাল টুইন (Digital Twin): বিশ্বকাপের প্রতিটি স্টেডিয়ামের একটি করে সরাসরি ভার্চ্যুয়াল অনুলিপি বা ‘ডিজিটাল টুইন’ থাকবে। সেখানে রিয়েল টাইমে স্টেডিয়ামের দর্শকের ঢল, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং এমনকি খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত লাইভ তথ্যও পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
২ এক্সাবাইট ডেটার মহাযজ্ঞ: ৪৫ হাজার বছরের ৪কে ভিডিও!
তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের মতে, এটাই হবে পৃথিবীর প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে ডেটা নিজেই একটি প্রধান পণ্য হিসেবে গণ্য হবে।
গ্লোবাল স্টোরেজ জায়ান্ট 'সানডিস্ক'-এর হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ থেকে শুধু মাঠের প্রযুক্তিগত কারণেই ৯০ পেটাবাইটের বেশি তথ্য তৈরি হবে, যা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ৪৫ গুণ বেশি! এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, সেলফি, লাইভ স্ট্রিমিং এবং মুঠোফোন ব্যবহার ধরলে মোট ডেটার পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ২ এক্সাবাইট-এ। ব্যাংক অব আমেরিকার মতে, এই পরিমাণ ডেটা প্রায় ৪৫ হাজার বছরের ‘৪কে (4K) ভিডিওর’ সমান!
স্টিয়ারিং ছাড়াই স্টেডিয়ামে: চালকহীন রোবোট্যাক্সি ও রোবট স্কোয়াড
মাঠের বাইরের প্রযুক্তি দর্শকদের দেবে সায়েন্স-ফিকশন সিনেমার মতো অভিজ্ঞতা। স্টেডিয়ামের বাইরে দর্শকদের যাতায়াতের জন্য নামছে চালকহীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ি বা রোবোট্যাক্সি। মোট ৭টি কোম্পানি ১০টি আয়োজক শহরে এই সেবা দেবে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় উপস্থিতি থাকবে চালকহীন গাড়ির নামী ব্র্যান্ড ‘ওয়াইমো’ (Waymo)-র। তারা ৭টি শহরে সাধারণ যাত্রী পরিবহন করবে এবং আরও ৩টি শহরে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালাবে।
পাশাপাশি, স্টেডিয়ামের ভেতরে ও বাইরে দেখা মিলবে মানবসদৃশ (Humanoid) রোবটের। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুন্দাই আমেরিকার কয়েকটি শহরে বোস্টন ডায়নামিকসের তৈরি বিখ্যাত ‘অ্যাটলাস’ ও ‘স্পট’ রোবট ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে। এগুলো স্টেডিয়াম পরিচালনা, খেলার সরঞ্জাম পরিবহন এবং সাধারণ দর্শকদের গাইড বা সহায়তা করার কাজে নিয়োজিত থাকবে।
ভবিষ্যতের খেলাধুলার ট্রেইলার
ক্রীড়াঙ্গনে এআইয়ের ব্যবহার এখনো শুরুর পথে হলেও ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে সেই মূল মঞ্চ, যেখানে ভবিষ্যতের খেলাধুলা নিজের বাস্তব রূপ দেখতে পাবে। সম্প্রতি অবশ্য আমেরিকার বেসবল দল ‘অকল্যান্ড বলার্স’ দল নির্বাচন থেকে শুরু করে ম্যাচ চলাকালীন খেলোয়াড় বদলের সিদ্ধান্তে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। এমনকি নরওয়ের ফুটবল ক্লাব ‘হামকাম এফসি’ এআই-কে তাদের প্রধান কোচ হিসেবে ব্যবহার করেও পরীক্ষা চালিয়েছে।
সব মিলিয়ে, আগামী জুনে বিশ্ববাসী কেবল একটি ফুটবল বিশ্বকাপই দেখবে না, বরং দেখবে মানব দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক অভূতপূর্ব যুগলবন্দী।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।

0 মন্তব্যসমূহ