এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ: পাসের হার কমে ৬২.২৫%, জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন
শিক্ষা ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১০ আগস্ট ২০২৬
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছর দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ফলাফল জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে একযোগে ফল প্রকাশ করা হয়। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অনলাইনে ফলাফল দেখতে পারছেন। ফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে।
সাধারণ ৯ বোর্ডে পাসের হার ৬৪.০৫ শতাংশ
শিক্ষা বোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বছর গড় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমেছে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফলাফলের এই পতন শিক্ষার্থীদের ফলাফল, শিক্ষাব্যবস্থার মান এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ–৫ পেয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন শিক্ষার্থী। এ বছর সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন।
অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক বছরে কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।
১১ শিক্ষা বোর্ডে পাস ৬২.২৫ শতাংশ
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল যুক্ত করলে দেশের মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এই হিসাবে চলতি বছর এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও প্রায় ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
সব বোর্ড মিলিয়ে জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে।
সকাল ১০টায় ফল প্রকাশ
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল সোমবার সকাল ১০টার দিকে প্রকাশ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
এরপর একই সময়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অনলাইনে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ঘরে বসেই ফলাফল জানতে পারছেন।
ফল প্রকাশের দিন দেশের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়। কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থী সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়। অন্যদিকে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও হতাশা দেখা যায়।
যেভাবে ফলাফল দেখা যাবে
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল অনলাইনে দেখতে শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলসংক্রান্ত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফল সংগ্রহ করতে পারবে।
শিক্ষার্থীরা eduboardresults.gov.bd এবং educationboardresults.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফলাফল জানতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট থেকেও ফলাফল দেখা যাবে।
এ ছাড়া মুঠোফোনের এসএমএসের মাধ্যমেও ফলাফল সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে। যেকোনো মুঠোফোন নম্বর থেকে ১৬১৪০ অথবা ১৬২২২ নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে ফলাফল জানা যাবে।
ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অযথা শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংবাদপত্রের কার্যালয়ে গিয়ে ফল খোঁজার প্রয়োজন নেই। নির্ধারিত অনলাইন ও এসএমএস সেবার মাধ্যমেই ফলাফল সংগ্রহ করা যাবে।
ফল পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ
যেসব শিক্ষার্থী তাদের প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তাঁদের জন্য পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১১ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করা যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের আবেদন করতে হবে।
পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষার খাতা নতুন করে মূল্যায়ন করা হয় না; বরং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী খাতা মূল্যায়নের বিভিন্ন ধাপ ও নম্বর প্রদানের বিষয় যাচাই করা হয়।
ফলাফলের নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে পাসের হার ও জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে এবারের ফলাফলকে গত কয়েক বছরের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করে শিক্ষার মান, প্রশ্নের কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিশ্লেষণের দাবি উঠতে পারে।
তবে শুধু পাসের হার কমেছে বলেই শিক্ষার মান কমেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন, মূল্যায়নের কঠোরতা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতিসহ একাধিক বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
উচ্চশিক্ষার নতুন প্রতিযোগিতা
এসএসসি ফল প্রকাশের পর এখন শিক্ষার্থীদের সামনে শুরু হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তির নতুন অধ্যায়। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পছন্দের কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নেবে।
বিশেষ করে জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নামী ও কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তির প্রতিযোগিতা বাড়বে। অন্যদিকে যেসব শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তাদেরও হতাশ না হয়ে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে ভালো করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও এটিই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। পরবর্তী পর্যায়ে নিয়মিত পড়াশোনা, দক্ষতা অর্জন এবং সঠিক ক্যারিয়ার পরিকল্পনাই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফলাফলের প্রধান তথ্য এক নজরে
| সূচক | ২০২৬ সালের ফলাফল |
|---|---|
| মোট শিক্ষা বোর্ড | ১১টি |
| ৯টি সাধারণ বোর্ডে পাসের হার | ৬৪.০৫% |
| গত বছর সাধারণ বোর্ডে পাসের হার | ৬৮.০৪% |
| সাধারণ বোর্ডে পাসের হার কমেছে | ৩.৯৯ শতাংশ |
| সাধারণ বোর্ডে জিপিএ–৫ | ১,০৬,০০৯ জন |
| ১১ বোর্ডে মোট পাসের হার | ৬২.২৫% |
| ১১ বোর্ডে মোট জিপিএ–৫ | ১,১৬,৬৭৬ জন |
| পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন | ১১–১৭ আগস্ট ২০২৬ |
চলতি বছরের ফলাফল তাই একদিকে হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে পাসের হার ও জিপিএ–৫ কমে যাওয়ায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান চিত্র নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। এখন শিক্ষার্থীদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফলাফলকে ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়া।


0 মন্তব্যসমূহ