মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর: মধ্যবিত্তের ‘কর্মযন্ত্রে’ নতুন করের বোঝা?
বিশেষ প্রতিবেদন, পকেট নিউজ| ১৪ মে, ২০২৬
দেশের বাজেট কেবল কিছু গাণিতিক সংখ্যার খেলা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দর্শনের প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর (AIT) আরোপের পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপ রাজস্ব বাড়াতে কার্যকর মনে হলেও, এর ফলে সরাসরি চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ।
প্রস্তাবিত করের হার এক নজরে
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসি (CC) ভেদে মোটরসাইকেলের ওপর বার্ষিক অগ্রিম আয়করের হার নির্ধারণ করা হয়েছে:
১১০ সিসি পর্যন্ত: করমুক্ত।
১১১ সিসি ও তার উপরে: বিভিন্ন শ্রেণিতে বছরে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর।
সরকারের যুক্তি: রাজস্ব ও সামঞ্জস্য
রাষ্ট্রের হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখের কাছাকাছি। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে:
রাজস্ব সম্প্রসারণ: ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ, বাস বা ট্রাকের মতো যানবাহনে আগে থেকেই অগ্রিম আয়কর প্রচলিত। তাই নীতিগত সমতা বজায় রাখতে মোটরসাইকেলকেও এই কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়: এই খাত থেকে আসা বিপুল রাজস্ব দেশের অবকাঠামো ও সামাজিক সেবা খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।
সমন্বয়যোগ্য: সরকার বলছে এটি ‘অগ্রিম’ কর, যা বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় মূল করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।
নাগরিক বাস্তবতা: বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার মাধ্যম
কাগজে-কলমে সরকারের যুক্তি শক্তিশালী মনে হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোটরসাইকেল এখন আর কোনো বিলাসদ্রব্য নয়। এটি এখন:
জীবিকার ভিত্তি: হাজার হাজার ডেলিভারি রাইডার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার আয়ের একমাত্র উৎস।
যানজটের বিকল্প: শহরের কর্মজীবী মানুষের জন্য সময় বাঁচানোর প্রধান মাধ্যম।
পেশাজীবীদের সাথী: মফস্বল বা জেলা শহরের আইনজীবী, সাংবাদিক বা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের চলাচলের অবিচ্ছেদ্য কর্মযন্ত্র।
দুই স্তরের কর: ন্যায্যতার প্রশ্ন
বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকদের প্রতিবছর 'ট্যাক্স টোকেন' নবায়নের সময় রোড ট্যাক্স ও নির্দিষ্ট সরকারি ফি দিতে হয়। এখন নতুন করে অগ্রিম আয়কর যুক্ত হওয়াকে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ‘একই সম্পদে দুইবার কর’ হিসেবে দেখছেন। ১১০ সিসি ও ১১১ সিসির মধ্যে করের যে বিভাজন রেখা টানা হয়েছে, তাকে অনেকে ‘কৃত্রিম’ বলে মনে করছেন। কারণ, একই ধরনের আয়ের মানুষ সামান্য সিসি পার্থক্যের কারণে করের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।
সামাজিক চুক্তিতে ফাটল?
রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক মূলত একটি সামাজিক চুক্তি। নাগরিক তার সামর্থ্য অনুযায়ী কর দেবে এবং রাষ্ট্র তার বিনিময়ে নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করবে। যখন নাগরিক অনুভব করে যে তার আয়ের তুলনায় করের বোঝা বাড়ছে, কিন্তু সে অনুপাতে নাগরিক সুবিধা বা স্বস্তি বাড়ছে না, তখন সেই আস্থার চুক্তিতে ফাটল ধরে।
সবশেষে প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং নীতিগত ভারসাম্যের। কর আদায়ের দক্ষতার চেয়ে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কতটা সহনশীল রাখা সম্ভব, রাষ্ট্রকে এখন সেই গুরুত্বের বিষয়টিই পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
হাতের মুঠোয় সকল খবর — পকেট নিউজ-এর সাথেই থাকুন।

0 মন্তব্যসমূহ