ট্রাম্প-সি বৈঠক: ইরানের যুদ্ধ আর তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১৫ মে ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতির দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আবারও মুখোমুখি। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সি চিন পিংয়ের হাতে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে ‘ইরান যুদ্ধ’। গত বছর খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধ থামানো সি এবার মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কাজে লাগিয়ে তাইওয়ান ইস্যুতে বড় ধরনের ছাড় আদায়ের লক্ষ্য স্থির করেছেন।
ইরান সংকট: সি চিন পিংয়ের ‘শান্তি’র কার্ড
যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সামরিকভাবে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে, তখন সি চিন পিং নিজেকে একজন ‘শান্তিপ্রয়াসী’ বিশ্বনেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের দেশগুলো এখন এই সংকট নিরসনে বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছে। ট্রাম্পের সফরের ঠিক আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেইজিং সফর স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তেহরানের ওপর চীনের প্রভাব কতটা গভীর।
হোয়াইট হাউস চায় চীন যেন ইরানের তেল কেনা বন্ধ করে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সি এই সুযোগটিকে ট্রাম্পের কাছ থেকে বড় কোনো সুবিধা আদায়ের দরকষাকষি হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তাইওয়ান ইস্যু ও ‘সিক্স অ্যাসিউরেন্স’ লঙ্ঘনের আশঙ্কা
সি চিন পিংয়ের মূল লক্ষ্য তাইওয়ানে মার্কিন হস্তক্ষেপ কমানো। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে তাইওয়ানের কাছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করেছে। সি চান, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে স্পষ্ট বিবৃতি দেয়।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাম্প তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদি তিনি বেইজিংয়ের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছান, তবে তা হবে ১৯৮২ সালের ‘সিক্স অ্যাসিউরেন্স’ বা ছয় নিশ্চয়তার সরাসরি লঙ্ঘন। রিগান আমলের এই নীতি অনুযায়ী, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য বিচ্যুতি চীনের জন্য হবে এক বিশাল কূটনৈতিক বিজয়।
মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
চীনা পণ্ডিতদের মতে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। ইরানের সাথে লড়াই করতে গিয়ে গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ব এশিয়া থেকে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে হচ্ছে। ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ জিনবো বলেন, “ইরান সংঘাত প্রমাণ করছে যে তাইওয়ান নিয়ে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এখন ওয়াশিংটনের নেই।”
নতুন সম্পর্কের সংজ্ঞায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা
সি চিন পিং কেবল বাণিজ্যিক ছাড় নয়, বরং পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমান মর্যাদার স্বীকৃতি চাইছেন। ২০১২ সাল থেকেই তিনি ‘বড় শক্তি’ হিসেবে চীনের সমকক্ষতা দাবি করে আসছেন। চীনের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে বেইজিংয়ের সাহায্য চায় (যেমন ফেন্টানিল পাচার রোধ), আবার অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়—এই ‘দ্বিমুখী নীতি’ আর চলবে না।
তবে চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে তারা এখন নিজস্ব চিপ এবং ‘ডিপসিক’-এর মতো এআই সিস্টেম তৈরি করছে, যা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
স্থিতিশীলতার মূল্য
আপাতত একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখতে চীন হয়তো কিছু মার্কিন পণ্য (যেমন বোয়িং বিমান, সয়াবিন ও গরুর মাংস) কেনার প্রতিশ্রুতি দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে চীন চায় সময় এবং সুযোগ, যাতে তারা প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে ‘জাতীয় আত্মনির্ভরশীলতা’ পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জন করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট সি এবং ট্রাম্পের এই বৈঠক কেবল দুটি দেশের বাণিজ্য নয়, বরং আগামী দশকের বিশ্ব ব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণ করে দিতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ