ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব সিনেটে নাকচ, ঘনিয়ে আসছে আইনি সময়সীমা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১ মে, ২০২৬
ইরানে নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ডেমোক্র্যাটদের আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নাকচ হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে ৪৭-৫০ ব্যবধানে প্রস্তাবটি বাতিল হয়। এমন এক সন্ধিক্ষণে এই ভোটাভুটি হলো, যার পরদিনই (আজ শুক্রবার) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এককভাবে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার ওপর আরোপিত আইনি সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে।
দলীয় অবস্থানের বাইরে কলিন্স ও পল
সিনেটে অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে রিপাবলিকান পার্টির ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়ে প্রস্তাবটি। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর সুসান কলিন্স এবং কেনটাকির র্যান্ড পল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম সুসান কলিন্স যুদ্ধবিরোধী কোনো প্রস্তাবে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিলেন। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট শিবিরের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান, যিনি প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।
১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন ও বর্তমান সংকট
মার্কিন সংবিধান ও ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি যুদ্ধে মার্কিন সৈন্য নিয়োজিত করলে ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। গত ২ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে সামরিক অভিযানের কথা কংগ্রেসকে জানিয়েছিল। সেই হিসেবে আজ ১ মে সেই ৬০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে। তবে সেনাদের নিরাপত্তার খাতিরে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ প্রেসিডেন্টের হাতে থাকলেও, কংগ্রেসের কোনো অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘ফেডারেল আইনের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।
"প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অসীম নয়"
ভোটের পর এক কড়া বিবৃতিতে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স বলেন, “কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অসীম নয়। সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ বা শান্তির বিষয়ে কংগ্রেসের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। ৬০ দিনের এই সময়সীমা কোনো পরামর্শ নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কৌশল থাকা জরুরি।
দ্বিধাবিভক্ত ক্যাপিটল হিল
এই ভোটাভুটি প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারা এখনো চরম দ্বিধাগ্রস্ত। গত দুই মাসে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ছয়বার যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা করলেও প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়েছেন। রিপাবলিকানদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের এই উদ্যোগ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।
তবে সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় রিপাবলিকানদের সুর কিছুটা নরম হতে দেখা গেছে। ওকলাহোমার সিনেটর জেমস ল্যাঙ্কফোর্ড এবং নর্থ ক্যারোলাইনার থম টিলিস মনে করেন, সরকার যদি ইরানে দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান চায়, তবে দ্রুত কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া উচিত।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
সিনেটে প্রস্তাবটি নাকচ হওয়ায় ইরান যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরও একটি সুযোগ হারাল কংগ্রেস। এখন দেখার বিষয়, আজ শুক্রবারের সময়সীমা পার হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ৩০ দিনের অতিরিক্ত সময় নেওয়ার সুযোগ ব্যবহার করে কি না, নাকি কংগ্রেসের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়। রিপাবলিকানরা বিকল্প হিসেবে সীমিত আকারে যুদ্ধের অনুমোদন বা স্থলসেনা মোতায়েনে নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছেন।
আট সপ্তাহে গড়িয়ে যাওয়া এই যুদ্ধ এখন কেবল রণক্ষেত্রেই নয়, ওয়াশিংটনের আইনি অলিন্দেও এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।

0 মন্তব্যসমূহ