যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন শঙ্কা


যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ২০ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল আবারও বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। দেশটির এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে নতুন মাত্রা দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানায়, দেশটির সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর কাতাম আল-আনবিয়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল ‘প্রথম পদক্ষেপ’; পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন করিডরগুলোর একটি। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হওয়া বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে ইরানের নতুন ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তেহরান জলপথটি পুনরায় খুলে দেয়।

কিন্তু এখনও দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও লেবাননে চলমান সংঘাত ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সেই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধের ঘোষণা শান্তি আলোচনার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আলোচনার দরজা এখনো খোলা

উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, তিনি শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে গিয়ে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

ভ্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এখনো যুদ্ধবিরতি কাঠামো টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আশাবাদী এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার বিষয়ে তাদের হাতে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছে। সেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করবে।

ইরানের কড়া বার্তা

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করবে।

তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট—যদি ওয়াশিংটন সমঝোতা অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি চাপ প্রয়োগের কৌশলও অব্যাহত রাখতে চায় তেহরান।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে, তারা নতুন অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাব বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুইজারল্যান্ডে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা। এই বৈঠকে উভয় পক্ষ সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে উত্তেজনা কমতে পারে।

তবে ইসরায়েল–লেবানন সীমান্তে সংঘাত অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। ফলে হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্ক—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স 

নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online