রাজধানীর চাঁদাবাজিতে সক্রিয় ১৪৮ অস্ত্রধারী: নেপথ্যে বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সিন্ডিকেট
বিশেষ প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ৮ মে, ২০২৬
রাজধানী ঢাকা এখন ১ হাজার ২৮০ জন চাঁদাবাজের কবলে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র দোকান থেকে শুরু করে বড় আবাসন প্রকল্প বা ঝুট ব্যবসা—কোথাও নিস্তার নেই এই চক্র থেকে। তবে সাধারণ চাঁদাবাজির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর স্তর, যা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ১৪৮ জন তালিকাভুক্ত পেশাদার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর মাধ্যমে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক এক তালিকায় এই শিউরে ওঠার মতো চিত্র উঠে এসেছে।
গুলশান-বাড্ডা-রামপুরা: অপরাধের ‘হটস্পট’
ডিএমপির তথ্যমতে, রাজধানীর মধ্যে চাঁদাবাজিতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এলাকা হলো গুলশান, বাড্ডা ও রামপুরা। বিশেষ করে বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় ৬০টি প্লট দখল করে বসা মাছের বাজার থেকে প্রতিদিন তোলা হয় প্রায় ৩ লাখ টাকা। এছাড়া গুলশান-বনানীর স্পা সেন্টার ও শাহজাদপুরের ফুটপাত থেকে রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপের সদস্যরা নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা সংগ্রহ করে।
রিমোট কন্ট্রোল চাঁদাবাজি: নির্দেশ আসে বিদেশ থেকে
তালিকায় দেখা গেছে, রাজধানীর অনেক সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। কিন্তু তাদের ইশারাতেই চলছে ঢাকার রাজপথ।
জিসান গ্রুপ: শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ বিদেশ থেকে তার বাহিনীর ১৮-২০ জন অস্ত্রধারী সদস্যের মাধ্যমে মগবাজার ও গুলশান এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছেন।
কলিং মেহেদী বাহিনী: যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী তার বিশাল বাহিনীর মাধ্যমে বাড্ডা ও মহাখালী এলাকায় ভাড়াটে খুনি ও চাঁদাবাজদের নেটওয়ার্ক চালাচ্ছেন।
রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ: এই গ্রুপের তিন নেতাই বর্তমানে মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকেই তারা বাড্ডার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন।
শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পুনরাবির্ভাব ও গ্রেফতার
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের বাহিনী নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে প্রশাসনের তৎপরতায় ২০২৫ সালের মে মাসে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিদেশি অস্ত্র ও গুলি।
এলাকার ভিত্তিতে সক্রিয় অস্ত্রধারী চক্র:
খিলগাঁও-সবুজবাগ: এই এলাকায় কিলার মিন্টু, কিশোর গ্যাং নেতা আলিফ ও রিফায়াতুল্লাহ নাইমের মতো সন্ত্রাসীরা সক্রিয়।
পুরান ঢাকা ও ডেমরা: শ্যামপুর, ডেমরা ও চকবাজার এলাকায় বিয়ার সালাউদ্দিন, কৃষ্ণ বাবু ও সজলের মতো সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে।
মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি: শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন গ্রুপ ও পিচ্চি হেলাল গ্রুপের সদস্যরা এই এলাকাগুলোতে এখনো সক্রিয় বলে পুলিশের তালিকায় উঠে এসেছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও অভিযান
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, গত ১ মে থেকে রাজধানীতে শুরু হওয়া সাঁড়াশি অভিযানে ৬ মে পর্যন্ত ১৪৫ জন তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ ও তাদের ২৫৬ সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, বিদেশে বসে যারা এসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে।
বিশেষজ্ঞের অভিমত
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, "অস্ত্রধারী চাঁদাবাজেরা অত্যন্ত ভয়ংকর। তারা চাঁদার জন্য প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটায়। শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, তারা যেন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসতে না পারে সেদিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে।"
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তালিকা করে অভিযান চালালেই এই জটিল জাল ছিঁড়বে না। চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ করতে হলে এই অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা এবং প্রশাসনিক সহযোগীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।

0 মন্তব্যসমূহ