Header Ads Widget

Responsive Advertisement

কোটি টাকার ‘ময়লা-বাণিজ্য’, অথচ ভাঙাড়ি বেঁচে চলে কর্মীদের সংসার

 

কোটি টাকার ‘ময়লা-বাণিজ্য’, অথচ ভাঙাড়ি বেঁচে চলে কর্মীদের সংসার; চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ঢাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

কোটি টাকার ‘ময়লা-বাণিজ্য’, অথচ ভাঙাড়ি বেঁচে চলে কর্মীদের সংসার; চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ঢাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা

বিশেষ প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৮ মে, ২০২৬

পচা-বাসি খাবার, ভাঙা প্লাস্টিক, নোংরা পলিথিন আর বোতলের স্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। আশপাশের পথচারীরা নাকে রুমাল চেপে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তীব্র গরমে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সেই ময়লা বোঝাই ভ্যান ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এক তরুণ ও এক কিশোর। যত কষ্টই হোক, বিকেল হওয়ার আগেই এই ময়লা পৌঁছাতে হবে সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রে (এসটিএস)।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়, রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রতিদিনের জীবনের নির্মম বাস্তবতা। একদিকে নগরবাসীর দেওয়া ময়লার ফি বাবদ প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে, যা চলে যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পকেটে; অন্যদিকে যাঁরা রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শহর পরিষ্কার রাখছেন, তাঁদের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

কোটি টাকার বাণিজ্য, কর্মীদের ভাগ্যে কেবল ‘crumbs’

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর বৈষম্যের চিত্র। ঢাকা শহরের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় নির্ধারিত ফি-এর (সর্বোচ্চ ১০০ টাকা) বাইরেও নাগরিকদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ময়লার বিল আদায় করা হয়।

যেমন—রাজধানীর বনানী এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ময়লার বিল নেওয়া হয়। শুধু এই এক এলাকা থেকেই মাসে ময়লা-বাণিজ্য বাবদ আদায় হয় প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অথচ এই বিপুল আয়ের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীদের কপালে জোটে সামান্য বেতন, কোনো কোনো এলাকায় তাও জোটে না।

এক নজরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভ্যান কর্মীদের আয়ের চিত্র:


এলাকা ও কর্মীমাসিক বেতনভাঙাড়ি বিক্রি থেকে বাড়তি আয়মন্তব্য
রুবেল ও সাইদুর (ডিএসসিসি ১৬ নম্বর ওয়ার্ড)

রুবেল: ১৩,০০০ টাকা


সাইদুর: ১০,০০০ টাকা

মাসে ৮,০০০ – ১০,০০৩ টাকা (দুজন ভাগ করে নেন)দৈনিক ৯-১০ ঘণ্টা কাজ করেন।
নয়ন মিয়া ও ৪ ভাই (গুলশান ৯১-৯২ নম্বর সড়ক)কোনো বেতন নেইপ্রতিদিন ভ্যান প্রতি ৬০০ – ৭০০ টাকাসম্পূর্ণ ভাঙাড়ি বিক্রির ওপর নির্ভরশীল। ১২ বছরের শিশুও যুক্ত।
কাউসার, মিস্টন ও আশরাফুল (গুলশান ও বনানী)কোনো বেতন নেইপ্রতিদিন ৬০০ – ৮০০ টাকাকেবল ভাঙাড়ি বিক্রির টাকায় সংসার চলে।
মোশাহিদ ও জুলেখা (ডিএনসিসি ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড)১২,৫০ Works টাকা (জনপ্রতি)প্রতিদিন ৭০ – ৮০ টাকাদরিদ্র এলাকা হওয়ায় ভাঙাড়ি কম পাওয়া যায়।
শফিক (কাওলা বাজার এলাকা)১৭,০০০ টাকানেই (সব মালিকের)বেতন বেশি হলেও ভাঙাড়ি রাখার অধিকার নেই

নিয়মের তোয়াক্কা নেই: উধাও সেফটি গিয়ার, ঝুঁকিতে শিশু শ্রমিকেরাও

সিটি করপোরেশনের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে—বর্জ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক, হাতমোজা ও গামবুট ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে এই কাজে কোনোভাবেই শিশু শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে না এবং ময়লা বহনের সময় ভ্যানের ওপর ত্রিপল বা ঢাকনা ব্যবহার করতে হবে।

বাস্তবতা হলো, ঢাকার কোথাও এই নিয়মের বালাই নেই। গুলশানের নয়ন মিয়ার ১২ বছর বয়সী ছোট ভাই ফরিদ কিংবা ডিএসসিসির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কিশোর সাইদুরের মতো অনেক শিশুই খালি হাতে, খালি পায়ে সরাসরি এই বিপজ্জনক বর্জ্য হাতড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া পকেট নিউজ-কে বলেন,

"বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ করা ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো শর্ত ঠিকমতো মানছে কি না, তা সেভাবে তদারক করা হয় না। এটি অস্বীকার করে লাভ নেই। তবে ভবিষ্যতে তাদের শর্ত মানতে বাধ্য করার চেষ্টা থাকবে। সিটি করপোরেশন থেকে একবার মাস্ক ও গামবুট দেওয়া হলেও কর্মীরা তা ঠিকমতো ব্যবহার করেনি।"

 

ময়লার দখল কার হাতে? বদলেছে শুধু রাজনৈতিক ‘ক্যাডার’

ঢাকার বর্জ্য অপসারণের এই বিশাল খাতটি সবসময়ই থেকেছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে। ঢাকা দক্ষিণে মোট ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও, বাস্তবে কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে এই ময়লা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও দলের নেতা-কর্মীরা।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ডের কোনোটিতেই বর্তমানে সিটি করপোরেশন অনুমোদিত কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে সেখানে যে যার মতো করে স্থানীয় দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ ও টাকা তোলার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে।

হাড়ভাঙা খাটুনির পর কাঁঠালবাগানের এক কক্ষের বাসায় মা ও ভাইকে নিয়ে থাকা ভ্যানচালক রুবেলের আক্ষেপ, "ময়লার কামে ম্যালা কষ্ট... দিনে ৯-১০ ঘণ্টা রাস্তায় কাটাই। মাস শেষে যে টেকা পাই, সেইডাতে পোষায় না। থাকন আর খাওনেই ম্যালা খরচা। কিন্তু কাম না করলে খামু কী?" রুবেলদের এই ঘাম ঝরানো উপার্জনে কোটিপতি বনে যাচ্ছে সিন্ডিকেট, আর রুবেলরা থেকে যাচ্ছেন সমাজের অন্ধকারেই।

পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ