রাশিয়া–বেলারুশের যৌথ পারমাণবিক মহড়া ঘিরে নতুন উদ্বেগ, ইউক্রেন সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা
রাশিয়া ও বেলারুশের সাম্প্রতিক যৌথ পারমাণবিক মহড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ‘ট্যাকটিক্যাল’ ও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের এই মহড়ায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলা এই মহড়াকে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে নতুন কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এই সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় শত শত রুশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও পারমাণবিক সাবমেরিন। মহড়া তদারকি করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো।
পারমাণবিক শক্তির প্রকাশ্য প্রদর্শন
মহড়ার সময় পুতিন ও লুকাশেঙ্কো ‘ইয়ার্স’ নামের আন্তমহাদেশীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের নির্দেশ দেন। ক্ষেপণাস্ত্রটি মাত্র ২০ মিনিটের কম সময়ে প্রায় ৫ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার দূরে কামচাতকা উপদ্বীপে আঘাত হানে। একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রকে রাশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
লুকাশেঙ্কো বলেন, “আমরা কাউকে হুমকি দিচ্ছি না। তবে আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় অস্ত্র রয়েছে। আমাদের ভূখণ্ড রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য শুধু প্রতিরক্ষামূলক বার্তা নয়; বরং পশ্চিমা বিশ্ব ও ন্যাটোর প্রতি এক ধরনের রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মহড়া
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বেলারুশ মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ হামলার পর বেলারুশ সংবিধান পরিবর্তন করে নিজেদের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের অনুমতি দেয়। এরপর থেকেই দেশটিতে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকে।
বর্তমানে বেলারুশে রাশিয়ার বিশেষ সংস্করণের সু-২৫ যুদ্ধবিমান, ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে। এসব অস্ত্র ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি আসিপোভিচি ঘাঁটিতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাশিয়া মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন সামরিক কৌশল যাচাই করছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোকে দেখাতে চাইছে যে, পারমাণবিক সক্ষমতা এখনো তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ইউক্রেনকে ঘিরে নতুন চাপের আশঙ্কা
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া বেলারুশকে নতুন করে যুদ্ধের অংশ বানানোর চেষ্টা করছে। তাঁর আশঙ্কা, পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না পাওয়ায় রাশিয়া উত্তর ইউক্রেন ও রাজধানী কিয়েভমুখী নতুন সামরিক চাপ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমানে বেলারুশে অবস্থানরত রুশ বাহিনীর সংখ্যা পূর্ণমাত্রার নতুন আক্রমণের জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁদের মতে, সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে লুকাশেঙ্কোর জন্য তা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
জার্মান গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া শুধু সামরিক অনুশীলন নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্যও বড় বার্তা।
অন্যদিকে অস্ত্রবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ট্যাকটিক্যাল’ পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হলেও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা বহুগুণ বেশি। ফলে এই দুই ধরনের অস্ত্র একসঙ্গে মহড়ায় ব্যবহার করা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বেলারুশের কৌশলগত অবস্থান
লুকাশেঙ্কো দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও পুরোপুরি মস্কোর নিয়ন্ত্রণে যেতে চান না বলেও ধারণা করা হয়। একদিকে তিনি রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিচ্ছেন, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও সীমিত যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
তবে সাম্প্রতিক এই মহড়া প্রমাণ করছে, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়ার কৌশলগত পরিকল্পনায় বেলারুশ এখন গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া–বেলারুশের এই যৌথ মহড়া শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; বরং এটি পশ্চিমা বিশ্বকে চাপ দেওয়ার কূটনৈতিক কৌশলও। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পারমাণবিক উত্তেজনাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ