Header Ads Widget

Responsive Advertisement

পাচার করা অর্থ ও আন্তর্জাতিক মামলা এড়ানোর কৌশল! আবারও নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন এস আলমের

 

মামলা এড়ানোর কৌশল! আবারও নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন এস আলমের, ‘ঝুঁকি’ দেখছে সরকার

মামলা এড়ানোর কৌশল! আবারও নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন এস আলমের, ‘ঝুঁকি’ দেখছে সরকার

জাতীয় ও অপরাধ প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৮ মে, ২০২৬

বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা আবারও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন। দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই আবেদন জমা দেওয়া হয়। সাইফুল আলম ছাড়াও তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব বাতিলের অনুরোধ করা হয়েছে এতে।

তবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান তীব্র আইনি ও আর্থিক জটিলতার কারণে সরকার আপাতত এস আলম পরিবারের এই আবেদন মঞ্জুর করতে চাইছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, এই মুহূর্তে তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন

নাগরিকত্ব দিলে সরকারের সামনে ২টি বড় ‘ঝুঁকি’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এস আলমের আবেদনটি পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে দুটি বড় ধরনের আইনি ও কৌশলগত ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে সরকার:

  • ১. পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জটিলতা: শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের কাছে দাবি করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। নাগরিকত্ব বাতিল হলে এই বিপুল পরিমাণ পাচারকৃত অর্থ আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

  • ২. আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় দেশের অবস্থান দুর্বল হওয়া: সাইফুল আলম নিজের সম্পদ সুরক্ষার দাবি তুলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে (ICSID) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তিনি যদি নিজেকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারেন, তবে ওই মামলায় বাংলাদেশের আইনি অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

"২০২০ সালে ত্যাগ, ২০২৩ পর্যন্ত ঋণ!"—নাগরিকত্ব নিয়ে চরম ধোঁয়াশা

এস আলমের আইনজীবীদের দাবি, ২০২০ সালেই সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯ জুলাই এক স্মারকের মাধ্যমে সাইফুল আলমের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন মঞ্জুর করেছিল।

তবে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের (২০২৫) নভেম্বরে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আওয়ামী লীগ আমলের সেই স্মারকটি স্থগিত করে দেন। ফলে সাইফুল আলমের নাগরিকত্বের বিষয়টি এখনো আইনিভাবে অমীমাংসিত।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আবদুল কাইয়ূম এই বৈপরীত্য তুলে ধরে  বলেন, "সাইফুল আলম যদি ২০২০ সালেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তবে তিনি কীভাবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন কোম্পানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নিলেন? এমনকি গত বছরও চট্টগ্রামের একটি মামলায় তিনি নিজেকে বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করেছিলেন। আসলে এখন নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করছেন যাতে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনের সুরক্ষা পেয়ে অর্থ ফেরতের দায় এড়াতে পারেন।"

২২ জুনের আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই ও ঢাকার প্রস্তুতি

সম্পদ জব্দ, ব্যাংক হিসাব স্থগিত এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তদন্তের বিরুদ্ধে গত অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে (ICSID) বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে এস আলম পরিবার। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির দোহাই দিয়ে তারা দাবি করেছে—তারা ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তাই সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারী হিসেবে বাংলাদেশে তাদের সম্পদ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আওতাধীন।

আগামী ২২ জুন (২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রে এই মেগা মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া এই আইনি লড়াই বর্তমান বিএনপি সরকারও শক্তভাবে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই লক্ষ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ একটি নামী ল’ ফার্মকে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি।

স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে জানান, "সরকার এই আন্তর্জাতিক মামলায় লড়তে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।"

 ৭ সংস্থার তদন্ত ও পাসপোর্টের সর্বশেষ অবস্থা

এস আলম পরিবারের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন মঞ্জুর হলে সরকার কী কী আইনি ফাঁদে পড়তে পারে, তা জানতে গত ৩ এপ্রিল সরকারের ৭টি সংস্থার (দুদক, নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিএফআইইউ, এসবি, এনএসআই এবং ডিজেএফআই) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এদিকে গত ১৩ মে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে জানানো হয়েছে যে, সাইফুল আলম, তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীন ও ছেলে আসাদুল আলমের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও সেগুলো এখনো তাদের ডেটাবেজে সক্রিয় ও সংরক্ষিত রয়েছে। তবে তাঁর আরেক ছেলে আশরাফুল আলমের পাসপোর্টের কোনো তথ্য অধিদপ্তরের সিস্টেমে পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বিদেশে পলাতক থাকা এই ধনাঢ্য ঋণখেলাপির নাগরিকত্ব ও সম্পদ উদ্ধারের এই লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা আগামী ২২ জুনের আন্তর্জাতিক আদালতের শুনানিতে অনেকটাই স্পষ্ট হবে।


পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ