ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: মার্কিন সামরিক ব্যয় নিয়ে পেন্টাগনের হিসাবে গরমিল, প্রকৃত খরচ হতে পারে ৫০ বিলিয়ন ডলার
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১ মে ২০২৬
ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবচিত্রের বিস্তর ফারাক রয়েছে বলে দাবি করছে বিভিন্ন সূত্র। পেন্টাগন প্রাথমিক ব্যয়ের একটি হিসাব দিলেও, সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
পেন্টাগনের হিসাব বনাম প্রকৃত চিত্র
গত বুধবার হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে পেন্টাগনের প্রধান হিসাবরক্ষক জুলস ‘জাই’ হার্স্ট জানান, ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলার। তবে এই হিসাবকে ‘অসম্পূর্ণ’ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পেন্টাগনের এই অংকে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর সংস্কার এবং ধ্বংস হওয়া যুদ্ধসরঞ্জামের প্রতিস্থাপন খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সিএনএন-এর প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, যদি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণ এবং ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের ব্যয় যোগ করা হয়, তবে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি (৪০-৫০ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছাবে।
যে বিশাল ক্ষতির মুখে মার্কিন বাহিনী
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়:
ঘাঁটি ধ্বংস: বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, ইউএই ও কাতারে অবস্থিত অন্তত ৯টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
রাডার সিস্টেম: জর্ডানে অবস্থিত অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’-এর রাডার সিস্টেম এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ভবন ধ্বংস হয়েছে।
বিমান ধ্বংস: সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি অত্যন্ত মূল্যবান ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ নজরদারি বিমান ধ্বংস হয়েছে।
পেন্টাগনের বাজেট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শুনানিতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আইনপ্রণেতা রো খান্না ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের হিসাব নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করে একে ‘একেবারেই সঠিক নয়’ বলে দাবি করেন। উল্লেখ্য যে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই খরচ হয়েছিল প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার।
ব্যয় সামলাতে প্রতিরক্ষা দপ্তর হোয়াইট হাউসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক তহবিলের জরুরি অনুরোধ জানিয়েছে। এদিকে ২০২৭ অর্থবছরের জন্য পেন্টাগন ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি (১.৫ ট্রিলিয়ন) ডলারের বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা বর্তমান বাজেটের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি।
সংস্কার ব্যয় কেন ঝুলে আছে?
জুলস হার্স্ট জানান, বিদেশে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো আদৌ আগের মতো পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, তা নিয়ে এখনো মূল্যায়ন চলছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এসব নির্মাণ ব্যয়ের একটি অংশ স্বাগতিক বা অংশীদার দেশগুলো বহন করতে পারে। ফলে সংস্কার বাবদ প্রকৃত ব্যয় এখনো চূড়ান্ত পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শুনানিতে অংশ নিলেও ঘাঁটিগুলোর সংস্কার ব্যয় নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পেন্টাগনের এই নীরবতা এবং ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে এখন উত্তপ্ত আলোচনা চলছে।

0 মন্তব্যসমূহ