জাতীয় দলের ফুটবলারদের ‘খেপ’ খেলা নিয়ে প্রশ্ন, সতর্কবার্তা দিতে চান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
ক্রীড়া প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয় দলের ফুটবলার হিসেবে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও পেশাদার চুক্তির অধীনে খেলছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। এ ছাড়া জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সরকার নিয়মিত ক্রীড়া ভাতাও দিয়ে থাকে। তবে এসব পেশাদার দায়িত্বের বাইরে গিয়ে জাতীয় দলের কয়েকজন ফুটবলারের স্থানীয় পর্যায়ের অর্থের বিনিময়ে ‘খেপ’ ম্যাচে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এবার প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি শেখ মোরছালিন, ফয়সাল আহমেদ, রাকিব হোসেনসহ জাতীয় দলের কয়েকজন ফুটবলারের বিভিন্ন এলাকায় খেপ ম্যাচে অংশ নেওয়ার খবর আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি নজরে এসেছে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকেরও। টাঙ্গাইল ও ঝিনাইদহে গিয়ে জাতীয় দলের বর্তমান খেলোয়াড়দের এমন ম্যাচ খেলতে দেখেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কালশীতে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন সাবেক জাতীয় ফুটবলার আমিনুল হক। তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করতে চান।
‘প্রথমে সতর্ক করতে চাই’
জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের খেপ ম্যাচে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনই সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে নন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তাঁর পরিকল্পনা, প্রথমে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়দের সতর্ক করা হবে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আমিনুল হক বলেন, তিনি ব্যস্ততার কারণে এখনো বাফুফের সভাপতির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেননি। তবে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে তাঁর সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খেপ ম্যাচে অংশ নেওয়া জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বিষয়টি বাফুফের নজরে আনা হবে। প্রথম পর্যায়ে তাঁদের সতর্ক করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এরপরও প্রয়োজন হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হবে।
সরকারি ভাতা ও পেশাদার চুক্তির পরও কেন ‘খেপ’?
খেপ ম্যাচ নিয়ে আপত্তির মূল জায়গাটি তুলে ধরে আমিনুল হক প্রশ্ন তুলেছেন, যে খেলোয়াড়েরা সরকার থেকে পেশাগত স্বীকৃতির অংশ হিসেবে নিয়মিত ক্রীড়া ভাতা পাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে ক্লাব পর্যায়ে পেশাদার চুক্তির অধীনে রয়েছেন, তাঁদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ের এমন ম্যাচে অংশ নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত।
তাঁর মতে, জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের দায়িত্ব শুধু মাঠে দেশের জার্সি পরে খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন পেশাদার ফুটবলারের নিজের ক্যারিয়ার, ক্লাব এবং জাতীয় দলের প্রতি দায়বদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত খেলোয়াড়দের পেশাদার মানসিকতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টিই সামনে এসেছে। তাঁর মতে, জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করা একজন খেলোয়াড়ের মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তও তাঁর পেশাদার পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
চোটের ঝুঁকি বড় উদ্বেগ
স্থানীয় পর্যায়ের খেপ ম্যাচ নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো খেলোয়াড়দের সম্ভাব্য চোট।
পেশাদার ফুটবলের মাঠ, চিকিৎসা ব্যবস্থা, রেফারিং, প্রতিপক্ষের মান এবং খেলার পরিবেশ সাধারণত নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের খেপ ম্যাচে সব সময় সেই একই ধরনের প্রস্তুতি বা নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না।
ফলে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় কোনো অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে চোট পেলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের ওপরই পড়ে না; জাতীয় দল ও ক্লাব—দুই পর্যায়ের পরিকল্পনাতেই এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ম্যাচ বা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব ম্যাচের আগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় চোটে পড়লে বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি এবং দলের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
আলোচনায় শেখ মোরছালিন
জাতীয় দলের ফুটবলারদের খেপ ম্যাচে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার ক্ষেত্রে শেখ মোরছালিনের নামও সামনে এসেছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের ম্যাচে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে।
এর পরই জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের পেশাদার আচরণ এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলা ফুটবলারদের স্থানীয় পর্যায়ের ম্যাচে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বাফুফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
এখন এই ঘটনায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অবস্থান কী হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত পেশাদার ফুটবল খেলেন। তাঁদের শারীরিক প্রস্তুতি, বিশ্রাম, ম্যাচের সময়সূচি এবং চোট ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই পেশাদার কাঠামোর অংশ। ফলে এর বাইরে কোনো ম্যাচে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ফেডারেশনের অনুমতি বা নীতিমালা থাকা উচিত কি না, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি বাফুফে সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান। অর্থাৎ এখনই কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসেনি।
শুধু ‘খেপ’ নয়, পেশাদার সংস্কৃতির প্রশ্ন
জাতীয় দলের ফুটবলারদের খেপ খেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কটি শুধু একটি ম্যাচে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের ফুটবলে পেশাদার সংস্কৃতি কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, খেলোয়াড়েরা নিজেদের ক্যারিয়ার ও জাতীয় দলের দায়িত্বকে কীভাবে দেখছেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের জন্য কী ধরনের আচরণবিধি তৈরি করেছে—এসব প্রশ্ন।
একদিকে খেলোয়াড়দের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, অন্যদিকে তাঁদের কাছ থেকেও পেশাদার আচরণ প্রত্যাশিত। বিশেষ করে জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা দেশের ফুটবলের অন্যতম মুখ হওয়ায় তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তরুণ ফুটবলারদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই স্থানীয় পর্যায়ের খেপ ম্যাচে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে এমন বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এতে খেলোয়াড়েরা কোন ধরনের ম্যাচে অংশ নিতে পারবেন, কখন পারবেন এবং জাতীয় দল বা ক্লাবের দায়িত্বের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয় পরিষ্কার করা যাবে।
এখন নজর বাফুফের সিদ্ধান্তে
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সতর্কবার্তার পর জাতীয় দলের ফুটবলারদের খেপ ম্যাচে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বাফুফে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
প্রথম পর্যায়ে খেলোয়াড়দের সতর্ক করা হবে, নাকি আরও কঠোর কোনো নীতিমালা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা নির্ভর করবে ফেডারেশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
তবে এই বিতর্ক জাতীয় দলের ফুটবলারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—জাতীয় দলের জার্সির সঙ্গে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, মাঠের বাইরের পেশাদার আচরণ ও দায়িত্ববোধও জড়িয়ে আছে। সরকারি ক্রীড়া ভাতা, ক্লাবের পেশাদার চুক্তি এবং জাতীয় দলের দায়িত্ব—সবকিছুর সমন্বয়ে একজন ফুটবলারের পেশাগত পরিচয় তৈরি হয়। সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাঠের বাইরের সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন বাংলাদেশের ফুটবলে আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।


0 মন্তব্যসমূহ