১০০ টাকায় ৫৬ টাকাই সরকারের! উচ্চ করের চাপে পিষ্ট দেশের টেলিযোগাযোগ খাত
বিশেষ প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৭ মে, ২০২৬
মোবাইল অপারেটররা মুঠোফোন সেবা থেকে যে ১০০ টাকা আয় করে, তার মধ্যে ৫৬ টাকাই কর ও ফি বাবদ নিয়ে নেয় সরকার। অতীতের সরকারগুলো টেলিযোগাযোগ খাতকে সেবার মানোন্নয়নের চেয়ে রাজস্ব আয়ের বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় আজ এর চরম ভুক্তভোগী দেশের সাধারণ মানুষ। বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি করের এই বোঝা টানতে গিয়ে অপারেটরগুলো নেটওয়ার্ক ও সেবার মান বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারছে না।
এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও বৈষম্যমূলক প্রেক্ষাপটেই আজ রবিবার (১৭ মে) দেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস’। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘ডিজিটাল জীবনধারা: সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’।
গ্রাহক ও অপারেটরদের ঘাড়ে করের বোঝা কত?
অপারেটরদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশের ডিজিটাল সেবাকে সস্তা করার পরিবর্তে গ্রাহক ও কোম্পানির ওপর বসানো হয়েছে উচ্চ করের স্তুপ:
গ্রাহকের করভার ৩৯%: বর্তমানে মুঠোফোন সেবায় গ্রাহককে ১৮% ভ্যাট (মূসক), ২০% সম্পূরক শুল্ক এবং ১% সারচার্জ দিতে হয়।
সিম প্রতি কর: নতুন সিম কেনা বা হারিয়ে যাওয়া সিম তুলতে গুনতে হয় ৩০০ টাকা।
করপোরেট কর: অপারেটরদের আয়ের ওপর করের হার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ।
রাজস্ব ভাগাভাগি: বিটিআরসি-কে মোট আয়ের ৫.৫% রাজস্ব ভাগ দিতে হয় এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে দিতে হয় ১%।
মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএ (GSMA) জানিয়েছে, টেলিযোগাযোগ খাতে বৈশ্বিক গড় কর যেখানে মাত্র ২২ শতাংশ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ২৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে সরকারের তহবিলে চলে যায় ৫৬ শতাংশ। রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম জানান, সব মিলিয়ে কার্যকর করের চাপ আসলে ৬৮ থেকে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়ায়, যা গত ১৫ বছর ধরে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করে রেখেছে।
নবায়ন ফি: প্রায় ১৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
অতিরিক্ত ভ্যাট: এর ওপর ৭.৫% হারে ভ্যাট আসবে আরও ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা।
চড়া দামে কমছে গ্রাহক ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী
বর্তমানে দেশে মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি ৬১ লাখ হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে বেশ পিছিয়ে। জিএসএমএর এক আশঙ্কাজনক তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মাত্র ২১ মাসে দেশে সক্রিয় মোবাইল গ্রাহক কমেছে প্রায় ১ কোটি। একই সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমে গেছে ১ কোটি ৩৩ লাখ। বিশ্লেষকদের মতে, সিমের ওপর অতিরিক্ত কর ও সেবার চড়া মূল্যই এর প্রধান কারণ।
সামনে আসছে আরও বড় আর্থিক ধাক্কা
চলতি ২০২৬ সালেই সব মোবাইল অপারেটরকে তাদের আগের নেওয়া তরঙ্গ (স্পেকট্রাম) নবায়ন করতে হবে।
কর কমানোর আভাস নতুন সরকারের
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকার রাজস্ব আদায়ের সহজ মাধ্যম হিসেবে এই খাতকে বিপাকে ফেললেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। গতকাল এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, "আমরা হয়তো সব সমস্যা এই বাজেটে সমাধান করতে পারব না। তবে ধারাবাহিকভাবে সমাধানের জন্য আমরা দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে পারব।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হলে সরকারকে ডেটা ও ভয়েস কল রেট সাশ্রয়ী করার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

0 মন্তব্যসমূহ