ঢাকায় অপরাধের লাগাম টানতে হিমশিম প্রশাসন, সক্রিয় ১১৭ অপরাধী চক্র; প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২১ জুন ২০২৬
রাজধানী ঢাকায় খুন, ছিনতাই, ডাকাতি ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি দেখাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, বাসার সামনে ছিনতাই, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর ওপর হামলা কিংবা পুলিশ সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণের মতো ঘটনা রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশের নিজস্ব তথ্য বলছে, অপরাধী চক্রগুলোর পরিচয় ও কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা থাকা সত্ত্বেও তাদের নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য আসছে না। ফলে একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
২১ মাসে ৫৯৭ খুন, ৭৭৩ ডাকাতি ও ছিনতাই মামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২১ মাসে ঢাকা মহানগরে ৫৯৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে অপরাধজগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। নিহতদের মধ্যে চারজন ছিলেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী।
একই সময়ে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৭৭৩টি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ অধিকাংশ ভুক্তভোগী মামলা করেন না, অনেকেই শুধু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন, আবার কোথাও কোথাও মামলা গ্রহণে অনীহার অভিযোগও রয়েছে।
রাজধানীতে সক্রিয় ১১৭ পেশাদার অপরাধী দল
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ১১৭টি পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি দলে গড়ে ১০ থেকে ২০ জন সদস্য রয়েছে। এসব চক্র ভাড়াটে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।
পুলিশের কাছে শুধু সদস্যদের পরিচয়ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাদের পৃষ্ঠপোষকদের তথ্যও রয়েছে। তবু অপরাধের ধারাবাহিকতা থামানো যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের নিয়ন্ত্রক বা ‘গডফাদারদের’ বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধ চক্রগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে।
আলোচিত ঘটনার পরই নড়ে প্রশাসন
অপরাধ বিশ্লেষকদের অভিযোগ, কোনো ঘটনা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল না হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয় না।
সম্প্রতি আদাবরে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে পুলিশ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে আদাবর থানার ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন। পরে জানা যায়, হামলাকারীরা ডিএমপির তালিকাভুক্ত ‘কবজিকাটা আনোয়ার’ গ্রুপের সদস্য।
একইভাবে মোহাম্মদপুরে মা-মেয়েকে চাপাতির মুখে জিম্মি করে ছিনতাইয়ের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ ও র্যাব সক্রিয় হয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তে উঠে আসে, একই চক্র এর আগেও একাধিক ছিনতাই করলেও সেসব ঘটনা আলোচনায় না আসায় কার্যকর তদন্ত হয়নি।
পুলিশের ওপর হামলাও বাড়ছে
রাজধানীতে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরাও। গত ২১ মাসে ঢাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি।
এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি বড় সূচক হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, অপরাধী চক্রগুলোর বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে শাস্তির নিশ্চয়তার অভাব অন্যতম কারণ।
তদন্তে অগ্রগতি কম, মূল হোতারা অধরাই
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কয়েকটি হত্যা ও ছিনতাই মামলায় মাঠপর্যায়ের অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষ হয়নি। পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে তদন্ত সংস্থাগুলো।
রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ হত্যা, নিউমার্কেটে টিটন হত্যা কিংবা যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যা—সব কটি মামলাতেই মূল হোতারা এখনো আইনের নাগালের বাইরে।
ডিবি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনেক নির্দেশদাতা দেশের বাইরে অবস্থান করায় এবং কারিগরি প্রমাণের ঘাটতির কারণে তদন্ত জটিল হয়ে পড়ছে।
জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় উদ্বেগ হলো, গ্রেপ্তার হওয়া অনেক অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের আলোচিত কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের অনেকেই ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এতে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং বিচার প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
‘গডফাদারদের’ ধরতে না পারলে অপরাধ কমবে না
ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তার মতে, শুধু সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মাঠপর্যায়ের অপরাধী শনাক্ত করলেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বিভিন্ন এলাকার অপরাধী চক্রের মূল পৃষ্ঠপোষক ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে অপরাধের চক্র ভাঙা কঠিন।
তাঁদের ভাষ্য, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রনির্ভর অপরাধের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা না গেলে অপরাধ কমবে না।
জবাবদিহির ঘাটতির কথা বলছেন সাবেক আইজিপি
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আবদুল কাইয়ুম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের জবাবদিহি, তদারকি ও আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব পর্যায়ে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর জবাবদিহির আওতায় না আনলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।
সরকারের পরিকল্পনা কী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুরকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অপরাধী চক্রগুলোকে নির্মূল করার উদ্যোগ চলছে।
অন্যদিকে ডিএমপি বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড, চেকপোস্ট এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি।
নিরাপত্তা সংকটে রাজধানী
বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে অপরাধের বর্তমান চিত্র শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার প্রতিফলন নয়; বরং এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত বহন করে। অপরাধীদের পরিচয় জানা থাকা সত্ত্বেও যদি অপরাধ থামানো না যায়, তাহলে শুধু অভিযান নয়, গোয়েন্দা নজরদারি, বিচারিক কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা, আলোচিত ঘটনার পর নয়—বরং অপরাধ সংঘটনের আগেই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ ঢাকা নিশ্চিত করবে প্রশাসন।
আরও পড়ুন
দুই ছেলের নামে ইউনিয়নের নামকরণ বিতর্ক: প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ
বিস্তারিত পড়ুন এখানেনিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ