বিশ্ব পরিবেশ দিবস: জলবায়ু সংকটের নেপথ্যে যুদ্ধ, সামরিক নির্গমন নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ৫ জুন ২০২৬
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে যখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ বা জলবায়ু তৎপরতার আহ্বান জানানো হচ্ছে, তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে যুদ্ধ, সামরিক ব্যয় এবং জলবায়ু সংকটের পারস্পরিক সম্পর্ক। পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে সামরিক কর্মকাণ্ড ও যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত থেকেছে, অথচ এর মূল্য চুকাতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে।
সবচেয়ে কম দূষণ, অথচ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি
বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের ‘বাংলাদেশ কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী বাংলাদেশ। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় শিকারও এই দেশ।
উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি দিন দিন বাড়ছে। কৃষিজমি হারিয়ে জীবিকা সংকটে পড়ছেন হাজারো মানুষ। কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল—সবখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান।
যুদ্ধের পরিবেশগত মূল্য কত?
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্যও বড় হুমকি।
সামরিক যান, যুদ্ধবিমান, নৌবহর, অস্ত্র উৎপাদন এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ব্যাপক কার্বন নির্গমন ঘটে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উল্লেখযোগ্য অংশ সামরিক খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে এই নির্গমনের বড় অংশই আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে আসে না।
‘মিলিটারি ইমিশন গ্যাপ’ নিয়ে উদ্বেগ
পরিবেশ গবেষকদের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হলো তথাকথিত ‘মিলিটারি ইমিশন গ্যাপ’।
বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামোতে অধিকাংশ দেশের জন্য সামরিক খাতের নির্গমন তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে অস্ত্র উৎপাদন, সামরিক মহড়া বা যুদ্ধ পরিচালনা থেকে ঠিক কতটা কার্বন নির্গমন হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিশ্ববাসীর সামনে আসে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রকৃত অগ্রগতি অর্জন করতে হলে সামরিক খাতের নির্গমন তথ্যও বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হবে।
যুদ্ধ ও উদ্বাস্তু সংকটের পরিবেশগত প্রভাব
যুদ্ধের ফলে শুধু কার্বন নির্গমনই বাড়ে না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বনভূমি, কৃষিজমি এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রও।
সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য নতুন আশ্রয়কেন্দ্র ও শরণার্থী শিবির গড়ে তুলতে হয়, যার প্রভাব পড়ে বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের ফলে কক্সবাজারের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি এর একটি বাস্তব উদাহরণ।
এ ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অবকাঠামো ধ্বংস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভাঙন এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতির কারণেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি হয়।
জলবায়ু সম্মেলনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত?
২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বাস্তবে অনেক দেশ এখনো তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে পিছিয়ে রয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং সামরিক ব্যয় বেড়েই চলেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনের পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বার্তা
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলাকে শুধু পরিবেশগত নয়, মানবিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবেও দেখতে হবে।
তাঁদের মতে, যুদ্ধ, সামরিকীকরণ এবং অস্বচ্ছ নির্গমন তথ্যের বিষয়গুলো সমাধান ছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জলবায়ু তহবিল বৃদ্ধি, নির্গমন কমানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পৃথিবীকে টেকসই রাখতে হলে শুধু কার্বন কমানোর প্রতিশ্রুতি নয়, যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবেশগত মূল্য নিয়েও বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে হবে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।
www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ