রূপপুরে নতুন অনিয়মের খোঁজ: ২৭ কোটির যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে ২১৪ কোটিতে, অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ| ৩০ জুন ২০২৬
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহুল আলোচিত ‘বালিশ কাণ্ড’-এর পর এবার আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’র বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনাকাটায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষায় দেখা গেছে, সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে ১১টি আবাসিক ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর কেনা হয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, সেগুলোর জন্য ঠিকাদারদের পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু এই খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।
যেভাবে বাড়ানো হয়েছে যন্ত্রপাতির দাম
নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, দরপত্রে মোট ব্যয় দাপ্তরিক প্রাক্কলনের কাছাকাছি রাখলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যন্ত্রপাতির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়। বিপরীতে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু পণ্যের দাম কমিয়ে দেখানো হয়, যাতে পুরো দরপত্রটি স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে—
একটি উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা, অথচ বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
একটি বিতরণ ট্রান্সফরমারের সরকারি মূল্য ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা, কিন্তু বিল দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা।
বিদ্যুতের ক্ষমতাগুণ ঠিক রাখার একটি পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেলের সরকারি মূল্য ছিল ১০ লাখ টাকারও কম, অথচ এর জন্য বিল করা হয়েছে ২ কোটি টাকা।
দুটি জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, কিন্তু পরিশোধ করা হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা
গ্রিন সিটির সাত নম্বর ভবনের হিসাবেই সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। মাত্র পাঁচ ধরনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের জন্য ওই ভবনে বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি দরে একই যন্ত্রপাতির মূল্য ছিল মাত্র ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
তিন ঠিকাদারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি ভবনের কাজ করে পেয়েছে প্রায় ৯২ কোটি টাকা, যদিও সরকারি হিসেবে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির মূল্য ছিল ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
সাজিন এন্টারপ্রাইজ চারটি ভবনের কাজের জন্য পেয়েছে ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ দুটি ভবনের কাজের জন্য পেয়েছে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, অথচ সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
নিয়ম মানেনি মূল্যায়ন কমিটি
সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেশি হলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির উচিত ছিল বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত জামানতের সুপারিশ করা। কিন্তু নিরীক্ষায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরির জন্য অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটি গঠনেরও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে পুরো ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
আরও পড়ুন
‘নির্বাচনী ইশতেহার রাজনৈতিক ধোঁকাবাজির অংশ’, রাষ্ট্রীয় পাটকল পুনরায় চালুর দাবিতে আনু মুহাম্মদের কড়া সমালোচনা
বিস্তারিত পড়ুন এখানেপ্রশাসনিক ব্যবস্থা ও অর্থ ফেরতের সুপারিশ
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য, বিল অনুমোদনকারী এবং বিল পরিশোধকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আপত্তিকৃত ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
টিআইবির উদ্বেগ
এ ঘটনাকে ‘মেগা দুর্নীতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত না হলে এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাঁর মতে, রূপপুর প্রকল্পের এই অনিয়মের নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কার্যকর বার্তা যায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। এখানে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের মাধ্যমে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন প্রকল্পের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় এমন বিপুল অনিয়মের তথ্য সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ