নেতানিয়াহু কি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সবচেয়ে বড় বাধা? মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সংকটের বিশ্লেষণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২২ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি চুক্তির অংশ না হয়েও এর কার্যকারিতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারেন।
সমঝোতা হলেও সংকট কাটেনি
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকে সই করে। তবে চুক্তিতে ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর পরপরই নেতানিয়াহু প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, তারা এই সমঝোতার কোনো শর্ত মানতে বাধ্য নয়।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে। এই অবস্থান চুক্তির বাস্তবায়নকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ওয়াশিংটনের ধৈর্যের পরীক্ষা
একসময় নেতানিয়াহুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প প্রকাশ্যে আরও সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইসরায়েলি নেতৃত্বকে সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির সামরিক সক্ষমতার বড় অংশই মার্কিন করদাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বার্তাগুলো ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিরই প্রতিফলন।
নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থানের পেছনে কেবল নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ঘোষিত অনেক লক্ষ্য পূরণ করতে পারেননি তিনি। তেহরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন কিংবা পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে দেশে দুর্নীতির মামলাসহ রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
আগামী নির্বাচনে ভোটারদের সমর্থন হারানোর আশঙ্কা এবং জোট সরকারের উগ্রপন্থী অংশীদারদের চাপ নেতানিয়াহুকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
‘স্পয়লার’ হিসেবে নেতানিয়াহু
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এমন পক্ষকে ‘স্পয়লার’ বলা হয়, যারা কোনো চুক্তির আনুষ্ঠানিক অংশ না হয়েও পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে নেতানিয়াহু সেই ভূমিকাতেই রয়েছেন। লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে তেহরান নতুন করে চুক্তি থেকে সরে আসার যুক্তি পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, নেতানিয়াহুর সরাসরি চুক্তি বাতিল করার প্রয়োজন নেই; বরং আঞ্চলিক সংঘাত অব্যাহত থাকলেই সমঝোতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন শঙ্কা
বিস্তারিত পড়ুন এখানেযুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের বৈপরীত্য
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র হলেও বাস্তবে তেল আবিবের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব সীমিত বলে মনে করেন অনেক গবেষক।
তাদের মতে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ইসরায়েলপন্থী লবি এবং প্রভাবশালী দাতাগোষ্ঠীর কারণে ইসরায়েলি নেতৃত্ব প্রায়ই এমন নীতিগত স্বাধীনতা ভোগ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্র রাষ্ট্রগুলো পায় না।
ফলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়া হোয়াইট হাউসের জন্য রাজনৈতিকভাবে সহজ নয়।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বর্তমানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াশিংটন দ্রুত সংঘাত কমিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চাইলেও নেতানিয়াহু মনে করছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা কার্যকর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এই কূটনৈতিক সমীকরণে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা কি বাস্তবায়নের পথে এগোবে, নাকি আঞ্চলিক সংঘাত ও রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনে তা ভেঙে পড়বে?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকে কার্যত বাইরে রেখে গড়ে ওঠা শান্তি উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর সেই বাস্তবতাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটকে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ