শিল্পে নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ: অনিশ্চয়তায় হাজারো কোটি টাকার বিনিয়োগ, দুশ্চিন্তায় উদ্যোক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের শিল্প খাতে নতুন করে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত। জ্বালানি সংকট কাটার আগ পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস–সংযোগ এবং বিদ্যমান শিল্পকারখানার গ্যাসের লোড বৃদ্ধি বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে হাজারো কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে গেছে। দেশের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী, ব্যাংক এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি সংকটে সরকারের কঠিন সিদ্ধান্ত
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই পেট্রোবাংলাকে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, দেশে চলমান গ্যাস–সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস–সংযোগ এবং বিদ্যমান শিল্পে লোড বৃদ্ধি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে জমা থাকা ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্প–সংযোগের আবেদন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংযোগের অর্থ জমা দিয়েও এখন পর্যন্ত গ্যাস পায়নি।
উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে ব্যবসায়িক ক্ষতি
চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কর্ণফুলী স্টিল মিলস স্থাপন করেছে টি কে গ্রুপ। কারখানাটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রও নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সময়মতো সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং উৎপাদিত পণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার সরকারের প্রতি দ্রুত গ্যাস সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শিল্প খাত বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে
দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর বহু প্রকল্প বর্তমানে গ্যাস–সংযোগের অপেক্ষায় থমকে আছে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কাচ ও রড উৎপাদনের দুটি কারখানা নির্মাণ করেছে। একটি কারখানার নির্মাণ শেষ হয়েছে আড়াই বছর আগে এবং অন্যটি দেড় বছর আগে। কিন্তু গ্যাস–সংযোগ না পাওয়ায় একটিও উৎপাদনে যেতে পারেনি।
উৎপাদন শুরু না হলেও এসব প্রকল্পের ঋণের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সিটি গ্রুপ মুন্সীগঞ্জের নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে পাঁচটি শিল্পকারখানা নির্মাণ করেও গ্যাস না পাওয়ায় চালু করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করলেও সরকারি গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় প্রকল্পগুলো এখনও অচল অবস্থায় রয়েছে।
এছাড়া স্কয়ার গ্রুপ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস–সংযোগ পুনরায় চালু এবং একাধিক কারখানার লোড বৃদ্ধির আবেদন করলেও এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। গ্যাস পাওয়া গেলে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ ভোলায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে এক হাজার একরজুড়ে শিল্পপার্ক গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎও গ্যাস–সংযোগের ওপর নির্ভর করছে।
ব্যাংক খাতেও বাড়ছে ঝুঁকি
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় ব্যাংক খাতেও উদ্বেগ বাড়ছে।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, গ্যাস না পেয়ে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন এলপিজি কিংবা এলএনজি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না, যা ব্যাংকিং খাতের জন্যও ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা?
সরকার সম্প্রতি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হয়েছে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, একদিকে বিনিয়োগ আহ্বান এবং অন্যদিকে নতুন শিল্পে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, গ্যাস–সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে।
সরকারের ব্যাখ্যা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় বিপুলসংখ্যক শিল্পে গ্যাস–সংযোগের অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের ব্যবস্থা করা হয়নি।
তিনি জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি আমদানি সম্প্রসারণ এবং নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেই নতুন শিল্পে গ্যাস–সংযোগ পুনরায় চালু করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মত
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দেশের বর্তমান গ্যাস–সংকট মূলত দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার ফল।
তার মতে, এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে ভোলা ও বরিশালের গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, বাপেক্সের নতুন কূপ খনন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে স্থায়ী সমাধান।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভর নীতির পরিবর্তে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোরও পরামর্শ দেন তিনি।
বিশ্লেষণ
বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাস–সংযোগ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য হয়তো তাৎক্ষণিক সংকট ব্যবস্থাপনার একটি পদক্ষেপ। তবে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই শিল্প খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাজারো কোটি টাকার বিনিয়োগ আটকে রয়েছে, উৎপাদন বিলম্বিত হচ্ছে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তাহলে শিল্পখাতের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। গ্যাস সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন বিনিয়োগের গতি ধরে রাখা এবং শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ