কম দামের পোশাকেও আর ধরে রাখা যাচ্ছে না ইউরোপের বাজার, এগিয়ে যাচ্ছে ভিয়েতনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
প্রকাশ: ১৭আগষ্ট ২০২৬
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে কম দামে মানসম্মত পোশাক সরবরাহের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু বৈশ্বিক পোশাকবাজারের সাম্প্রতিক পরিবর্তন বলছে, শুধু কম দাম আর বড় উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সেই অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ইইউর পোশাক আমদানির পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রি করে ভিয়েতনাম তাদের রপ্তানি প্রায় স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইইউর পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইইউর বাজারে বাংলাদেশ ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ রপ্তানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ।
অর্থাৎ শুধু পোশাকের পরিমাণ কমেনি, একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও কমেছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ প্রতি কেজি তৈরি পোশাক গড়ে ১৫ দশমিক ২৪ ইউরো দরে রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরের একই সময়ে সেই দাম কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরো—এক বছরে কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটি চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইইউতে ২ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। যদিও পরিমাণের হিসাবে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, তবু বেশি দামে বিক্রির কারণে তাদের মোট রপ্তানি আয় সামান্য বেড়েছে।
প্রতি কেজি পোশাকে বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি দাম ভিয়েতনামের
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রপ্তানি মূল্যের পার্থ্যই বর্তমান প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি।
ইউরোস্ট্যাটের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ভিয়েতনাম প্রতি কেজি তৈরি পোশাক গড়ে ২৯ দশমিক ৩২ ইউরো দরে রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে তাদের গড় মূল্য ছিল ২৫ দশমিক ৮৪ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরে ভিয়েতনামের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ছিল মাত্র ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরো।
অর্থাৎ একই বাজারে বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনামের পোশাক প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৪৪ ইউরো বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ফলে ভিয়েতনাম তুলনামূলক কম পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেও অর্থের হিসাবে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে।
এটি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। কারণ, এতদিন কম উৎপাদন ব্যয় ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের সুবিধাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ক্রেতাদের চাহিদা ও পণ্যের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের হিস্যাও কমেছে
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইইউর ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৪১ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আমদানি কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ।
অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে পোশাকের সামগ্রিক চাহিদাই কমেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো—ইইউর মোট আমদানি যতটা কমেছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে তার চেয়ে অনেক বেশি।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ইইউর মোট তৈরি পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ০৩ শতাংশে।
২০১২ সাল থেকে চীনের পর ইইউর বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী বাংলাদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখলেও বাজারের অংশীদারত্বের জায়গায় চাপ বাড়ছে।
ইইউর বাজারে এখনো চীন সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইইউর মোট তৈরি পোশাক আমদানির প্রায় ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও তার বাজার অংশ কমেছে। বিপরীতে ভিয়েতনামের বাজার অংশ সামান্য বেড়েছে।
কম দামের কৌশল কি এখন আর যথেষ্ট নয়?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা। তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহ নয়, এখন ক্রেতারা পণ্যের বৈচিত্র্য, কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, দ্রুত সরবরাহ, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই জায়গায় বাংলাদেশের কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে, অন্যদিকে ভিয়েতনামের বেড়েছে। এর অর্থ হলো—ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজিত বা বাজারের চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারছে।
কটনের পোশাকে বাংলাদেশের নির্ভরতা, এমএমএফে ভিয়েতনামের এগিয়ে থাকা
তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, দুই দেশের পণ্যের ধরনেও বড় পার্থক্য রয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজের মতে, গত মৌসুমে তুলার বাজার অস্থির থাকায় কৃত্রিম তন্তু বা এমএমএফ (ম্যান-মেড ফাইবার) পোশাকের চাহিদা বেড়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক কারখানা এখনো কটন বা তুলাভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
অন্যদিকে ভিয়েতনামের কারখানাগুলো এমএমএফ পোশাক উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। ফলে বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সুবিধা তারা নিতে পেরেছে।
এখানেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য বড় একটি শিক্ষা রয়েছে। ভবিষ্যতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং পণ্যের বৈচিত্র্য ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠছে।
ভারতের সঙ্গেও বাড়ছে প্রতিযোগিতা
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি নতুন চাপ তৈরি করছে ভারত। শেখ এইচ এম মোস্তাফিজের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কটন পোশাকের কিছু ক্রয়াদেশ ইতিমধ্যে ভারতের দিকে সরতে শুরু করেছে।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি ইইউর সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এর ফলে ইউরোপীয় ক্রেতারা ভারতের সরবরাহকারীদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করছেন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুবিধার কাঠামোও পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে একই বাজারে ভারত, ভিয়েতনাম, চীনসহ প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও কঠিন হতে পারে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটেও উদ্বেগ বাড়ছে
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পরিস্থিতিও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ জানিয়েছেন, বর্তমানে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমের জন্য ক্রয়াদেশ দেওয়ার সময় চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের কারখানাগুলো প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে।
তাঁর আশঙ্কা, উৎপাদন পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিতে পারেন। কারণ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না।
এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের পোশাক খাত একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে সময়মতো ক্রয়াদেশ সরবরাহেও সমস্যায় পড়তে পারে।
জুনে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত
তবে পুরো চিত্রই নেতিবাচক নয়। চলতি বছরের জুন মাসের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা আশার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউর বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।
ফলে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও মোট রপ্তানি মূল্য বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এতে বোঝা যায়, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং সঠিক পণ্য, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে বাজার পুনরুদ্ধারের সুযোগ এখনো রয়েছে।
সামনে যে পরিবর্তন জরুরি
ইইউর বাজারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—শুধু কম দামে বেশি পোশাক রপ্তানি, নাকি বেশি মূল্য সংযোজনের দিকে যাত্রা?
বর্তমান প্রবণতা বলছে, দ্বিতীয় পথটিই ভবিষ্যতের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে কটননির্ভরতা কমিয়ে এমএমএফ ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি, নকশা, উৎপাদন দক্ষতা ও দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু কম দাম নয়, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা চান।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের ক্রেতা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক সাফল্য দেখিয়ে দিচ্ছে—কম দাম একা আর যথেষ্ট নয়।
বাজার ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে এখন কম দামের পোশাকের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের, বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের দিকে দ্রুত এগোতে হবে। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাকবাজার ইউরোপে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শক্ত অবস্থান ধীরে ধীরে প্রতিযোগীদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।


0 মন্তব্যসমূহ