রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের জোর গুঞ্জন: উত্তরসূরি নির্বাচনেও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা, রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক ,পকেট নিউজ| ২৩ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগের খবর। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি শিগগিরই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো বঙ্গভবন কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি, তবুও রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়েও ক্ষমতাসীন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য কয়েকজনের নাম ঘুরে বেড়ালেও সম্প্রতি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনকারী একজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পদত্যাগের ইঙ্গিত, কারণ হিসেবে থাকতে পারে শারীরিক অসুস্থতা
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের শারীরিক অবস্থা আগের তুলনায় দুর্বল হওয়ায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় রয়েছে। দায়িত্বশীল একটি রাজনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, ইতোমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগের বিষয়ে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
বঙ্গভবনসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি নিজেও তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিগগিরই বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন। পদত্যাগের পর কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কিংবা সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি এখন পর্যন্ত এসব তথ্যের আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করেননি।
উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জনের পাশাপাশি তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা তুঙ্গে।
এর আগে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খানসহ কয়েকজনের নাম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় থাকলেও বর্তমানে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী একজন চুক্তিভিত্তিক সচিবের নাম নতুন করে সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, তিনি এমন কোনো আলোচনা সম্পর্কে অবগত নন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বিভিন্ন নাম আলোচনায় আসা স্বাভাবিক।
সংবিধান কী বলছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন।
আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অসুস্থতা, অনুপস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে এবার রাজনৈতিক গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
কারণ, নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে নির্বাচনকালীন সাংবিধানিক দায়িত্ব, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সাংবিধানিক সিদ্ধান্তে নতুন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ কারণে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকেরা এমন একজন ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চাইছেন, যিনি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা রাখেন।
২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়াগুলো রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সময়েই সম্পন্ন হয়।
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের পথে যায়নি নতুন সরকার।
তবে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনের দাবিতেও ছিলেন রাষ্ট্রপতি
গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও জুলাই আন্দোলনের নেতারা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। এ দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়।
তবে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।
অতীত নিয়েও ছিল বিতর্ক
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন। পরে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এসব দায়িত্ব পালনের সময় এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে কৌতূহল
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে। একই সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রথমবারের মতো নিজেদের মনোনীত একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার সুযোগ পাবে।
তবে পুরো বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। সরকার, বঙ্গভবন কিংবা রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে কোনো ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি রাজনৈতিক সূত্রভিত্তিক তথ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন দেশের রাজনীতিতে এই ইস্যুটি অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হওয়ার আভাস মিলছে।


0 মন্তব্যসমূহ