বাংলাদেশকে কম দামে ইউরিয়া সার দিতে আগ্রহী রাশিয়া, প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামের প্রস্তাব
খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ; ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সার সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ মার্কিন ডলার কম দামে ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (G2G) চুক্তির আওতায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার বাংলাদেশে রপ্তানির আগ্রহও প্রকাশ করেছে রাশিয়া।
মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সচিবালয়ে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ভিয়াচেস্লাভ সেন্টিউরিনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে শিল্পসচিব আবদুন নাসের খান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
কম দামে ইউরিয়া সরবরাহের প্রস্তাব
বৈঠকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জেএসসি এফইসি প্রোডিনটর্গ (JSC FEC Prodintorg)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)-এর কাছে সরকার-টু-সরকার (G2G) ভিত্তিতে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ বর্তমানে যেসব দেশ থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করে, তার তুলনায় প্রতি টনে ১০ মার্কিন ডলার কম দামে সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারের সার আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে এবং কৃষকদের জন্য সার সরবরাহ আরও স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি সহযোগিতায় গুরুত্ব
বৈঠকে শুধু সার নয়, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য অংশীদারত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। উভয় দেশই খাদ্য সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে সার ও খাদ্যপণ্যের মূল্য ওঠানামার মধ্যে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে দিক থেকে রাশিয়ার এই প্রস্তাব কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
টিসিবির জন্যও বাড়তে পারে সহযোগিতা
বৈঠকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং জেএসসি এফইসি প্রোডিনটর্গ-এর মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের (MoU) আওতায় সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও কার্যকর করার বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।
খাদ্যপণ্য রপ্তানিতেও আগ্রহী রাশিয়া
ইউরিয়া সারের পাশাপাশি বাংলাদেশে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য রপ্তানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া।
রাশিয়ার প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে—
সূর্যমুখী তেল,
হলুদ মটরশুঁটি,
ছোলা,
লাল মসুর ডাল,
সবুজ মসুর ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহ করতে প্রস্তুত।
তারা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাজারে মূল্যস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছে।
বাণিজ্য সম্প্রসারণে জোর
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির রাশিয়ার এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সমান সুবিধার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে সরকার কাজ করবে।
উভয় পক্ষ নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একমত হয়।
কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে ইউরিয়া সারের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে—
সরকারের আমদানি ব্যয় কমবে,
সার ভর্তুকির চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে,
কৃষকদের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো সহজ হবে,
কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে,
খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
কৌশলগত সম্পর্কের নতুন মাত্রা
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, কৃষি এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবার সার, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও গভীর করবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য উৎস নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
সংক্ষেপে মূল তথ্য
রাশিয়ার প্রস্তাব: আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ মার্কিন ডলার কম দামে ইউরিয়া সার।
সম্ভাব্য সরবরাহ: প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার (G2G ভিত্তিতে)।
ক্রেতা প্রতিষ্ঠান: বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।
অতিরিক্ত আগ্রহ: সূর্যমুখী তেল, ছোলা, মসুর ডাল, মটরশুঁটিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য রপ্তানি।
লক্ষ্য: খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার, আমদানি ব্যয় কমানো এবং বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ।
রাশিয়ার এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে সারের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সরকারের আমদানি ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য ও কৃষি সহযোগিতায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।


0 মন্তব্যসমূহ