২০২৬ বিশ্বকাপে রেকর্ড আয় ফিফার, ১৫ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে নতুন ইতিহাস
টিকিট, হসপিটালিটি ও বাণিজ্যিক আয়ে বিস্ময়কর সাফল্য; আরও শক্তিশালী ইনফান্তিনো, ভবিষ্যতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজনের জোরালো সম্ভাবনা
নিজস্ব প্রতিবেদক| পকেট নিউজ
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়েই নয়, অর্থনৈতিক সাফল্যেও ইতিহাস গড়েছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবারের বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) আয় করেছে বলে জানা গেছে। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয় এবং ফিফার জন্য এক নতুন আর্থিক মাইলফলক।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফা ইতোমধ্যে সদস্যদেশগুলোর ফুটবল সংস্থাকে এই আয়ের তথ্য জানিয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি, তবে খুব শিগগিরই সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি আয়
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা এই টুর্নামেন্ট থেকে ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় হয়েছে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অতিরিক্ত আয় প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা বিশ্বের অন্যতম সফল ক্রীড়া আয়োজন হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কোথা থেকে এলো এত আয়?
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত আয়ের প্রধান উৎস ছিল—
ভিআইপি ও হসপিটালিটি প্যাকেজ
ম্যাচের টিকিট বিক্রি
সেকেন্ডারি (পুনর্বিক্রয়) টিকিট বাজার
স্পনসরশিপ ও বাণিজ্যিক চুক্তি
সম্প্রচারস্বত্ব ও ডিজিটাল কনটেন্ট
বিশেষ করে সেকেন্ডারি টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে ফিফা ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে কমিশন নিয়েছে। ফলে টিকিটের উচ্চমূল্যের বড় অংশ সরাসরি ফিফার আয়ে যুক্ত হয়েছে।
ভিআইপি টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের সন্ধ্যা পর্যন্তও ফিফার অফিসিয়াল টিকিট পোর্টালে ভিআইপি ও হসপিটালিটি প্যাকেজ বিক্রি চলছিল।
সবচেয়ে আলোচিত ‘ট্রফি লাউঞ্জ’ প্যাকেজের প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল ৩৪ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৪২ লাখ টাকারও বেশি।
এ ধরনের উচ্চমূল্যের টিকিট বিক্রিই এবারের বিশ্বকাপের আয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সদস্য দেশগুলোও পেতে পারে বাড়তি সুবিধা
বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত অতিরিক্ত আয়ের একটি অংশ ফিফার সদস্যভুক্ত জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর উন্নয়নে ব্যয় করা হতে পারে।
যদিও অর্থ বণ্টনের চূড়ান্ত কাঠামো এখনো নির্ধারণ হয়নি, তবে উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ এবং গ্রাসরুট ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ফুটবলও দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হতে পারে বলে মনে করছেন ক্রীড়া অর্থনীতিবিদরা।
বিতর্কের মধ্যেও শক্ত অবস্থানে ইনফান্তিনো
২০২৬ বিশ্বকাপের আয় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপ চলাকালে বেশ কয়েকটি বিতর্ক তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করেছে ফিফা।
যদিও ফিফা দাবি করেছে, সিদ্ধান্তটি তাদের স্বাধীন শৃঙ্খলা কমিটি নিয়েছে।
পুনর্নির্বাচনের পথ আরও সহজ
বিতর্ক থাকলেও আর্থিক সাফল্য ইনফান্তিনোর অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
আগামী মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগে তিনি ইতোমধ্যেই ২০০টিরও বেশি সদস্য সংস্থার সমর্থন নিশ্চিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল আর্থিক লাভের কারণে অনেক সদস্যদেশ প্রকাশ্যে সমালোচনা থেকে সরে এসেছে।
আবারও কি যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ?
বিশ্বকাপ আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজন ব্যাপক বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিয়েছে।
ফলে ভবিষ্যতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ২০৩৮ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র আবার আয়োজক হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
সম্প্রতি এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন,
"আপনারা আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দিন।"
তিনি আরও জানান, ২০২৯ সালের ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়েও ফিফার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা
ফিফার এবারের বিশ্বকাপ আয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আয় বাংলাদেশের একটি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান।
এটি বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক শক্তি এবং বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তারের একটি বড় উদাহরণ।
বিশ্লেষণ: বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবল নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ব্র্যান্ড
২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, আধুনিক ফুটবল এখন শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক আয়োজন। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, হসপিটালিটি, পর্যটন এবং উচ্চমূল্যের টিকিট বিক্রির মাধ্যমে বিশ্বকাপ আজ বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ফিফার রেকর্ড ১৫ বিলিয়ন ডলারের আয় শুধু সংস্থাটির আর্থিক ভিত্তিকেই শক্তিশালী করেনি, বরং ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ আয়োজনের ধরন, আয়বণ্টন এবং বৈশ্বিক ফুটবল অর্থনীতির নতুন দিকনির্দেশনাও তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই বিপুল আয়ের কতটা সত্যিকার অর্থে সদস্যদেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয় এবং বিশ্ব ফুটবলের সামগ্রিক বিকাশে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online

0 মন্তব্যসমূহ