মাটির নিচে প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র: গুলিস্তানের পাতাল মার্কেট, যেখানে নতুন জীবন পায় হাজারো মোবাইল ফোন
১৯৯৭ সাল থেকে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল সার্ভিস হাব—১০৪টি দোকান, ৪০০-এর বেশি টেকনিশিয়ান, প্রতিদিন হাজারো গ্রাহকের আস্থা
প্রযুক্তি ডেস্ক | পকেট নিউজ
ঢাকার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তানের সড়কের নিচে গড়ে উঠেছে এক অনন্য প্রযুক্তিনির্ভর বাজার, যা সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত ‘পাতাল মার্কেট’ নামে। বাইরে থেকে এটি হয়তো একটি সাধারণ আন্ডারপাসের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। সারি সারি দোকান, শত শত টেকনিশিয়ানের ব্যস্ততা, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা গ্রাহকদের ভিড়ে প্রতিদিনই মুখর থাকে এই মার্কেট।
১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই পাতাল মার্কেট বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল ফোন সার্ভিসিং ও যন্ত্রাংশের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে রয়েছে ১০৪টি বড় দোকান, আর এসব দোকানের ভেতরে ও সামনে কাজ করেন চার শতাধিক দক্ষ টেকনিশিয়ান। অনেকেই একে ভালোবেসে বলেন ‘মোবাইলের ঢাকা মেডিকেল’, কারণ দেশের যেকোনো প্রান্তে কোনো মোবাইল ফোন মেরামত সম্ভব না হলে শেষ ভরসা হয়ে ওঠে এই মার্কেট।
আন্ডারপাসের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রযুক্তির শহর
পাতাল মার্কেটের চারদিকে রয়েছে মোট আটটি প্রবেশপথ। প্রতিটি প্রবেশপথ মূলত পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য নির্মিত হলেও সময়ের সঙ্গে এটি রূপ নিয়েছে প্রযুক্তিপ্রেমীদের অন্যতম গন্তব্যে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই মার্কেটে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সেবা দেওয়া হয়। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া সপ্তাহের বাকি ছয় দিনই এখানে জমজমাট থাকে ব্যবসা।
মার্কেটে প্রবেশ করলেই দেখা যায়, কোথাও টেকনিশিয়ান মাইক্রোস্কোপের নিচে মোবাইলের ক্ষুদ্র সার্কিট পরীক্ষা করছেন, কোথাও আবার ডিসপ্লে পরিবর্তন, মাদারবোর্ড রিপেয়ার কিংবা সফটওয়্যার আপডেটের কাজ চলছে। ছোট ছোট ওয়ার্কস্টেশনগুলোতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে জটিল সমস্যার সমাধান করা হয়।
দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন গ্রাহক
পাতাল মার্কেট পরিচালনা কমিটির অফিস সচিব আবদুর রহমান জানান, এই মার্কেট শুধু রাজধানীর মানুষের ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও অসংখ্য মানুষ তাঁদের বিকল মোবাইল ফোন নিয়ে এখানে আসেন।
এখানে যেসব সেবা সবচেয়ে বেশি দেওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে—
ভাঙা ডিসপ্লে পরিবর্তন
চার্জিং পোর্ট মেরামত
ব্যাটারি পরিবর্তন
মাদারবোর্ড রিপেয়ার
সফটওয়্যার ফ্ল্যাশ ও আনলক
ক্যামেরা ও স্পিকার পরিবর্তন
ব্যাক কভার ও ফ্রেম সংযোজন
পানিতে নষ্ট হওয়া ফোন উদ্ধার
ডেটা রিকভারি
এ কারণে দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মোবাইল রিপেয়ারিং কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে গুলিস্তানের এই পাতাল মার্কেট।
কেন বলা হয় ‘মোবাইলের ঢাকা মেডিকেল’?
প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করা টেকনিশিয়ান মো. রিফাত হোসেন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে কোনো মোবাইল ফোন ঠিক করা সম্ভব না হলে সেটি শেষ পর্যন্ত পাঠানো হয় এই মার্কেটে।
তাঁর ভাষায়,
"যেভাবে বিভিন্ন জেলা হাসপাতাল থেকে জটিল রোগীকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়, ঠিক তেমনি মোবাইল ফোনও শেষ পর্যন্ত আসে পাতাল মার্কেটে।"
এক দোকানে সমাধান না মিললে আরেক দোকানে, সেখানেও না হলে অন্য কোনো বিশেষজ্ঞ টেকনিশিয়ানের কাছে পাঠানো হয়। ফলে প্রায় সব ধরনের সমস্যারই সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়।
প্রতিদিন শত শত মোবাইল ফিরে পায় নতুন জীবন
২০১০ সাল থেকে এখানে ব্যবসা করছেন কবির টেলিকমের স্বত্বাধিকারী কবির হোসেন। তিনি জানান, প্রতিটি দোকানে যদি গড়ে পাঁচজন টেকনিশিয়ান কাজ করেন এবং প্রত্যেকে প্রতিদিন পাঁচটি করে মোবাইল মেরামত করেন, তাহলে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মোবাইল ফোন নতুন জীবন ফিরে পায়।
এর ফলে গ্রাহকদের নতুন মোবাইল কেনার প্রয়োজন কমে যায়। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে নতুন ফোন আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমে।
তিনি বলেন,
"আমরা মোবাইল তৈরি করি না, কিন্তু যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও দক্ষতার মাধ্যমে একটি অচল ফোনকে আবার সচল করে তুলি। এতে গ্রাহকের যেমন অর্থ সাশ্রয় হয়, তেমনি ই-ওয়েস্টও কমে।"
এখন মূল ব্যবসা মোবাইল সার্ভিসিং
একসময় পাতাল মার্কেট ছিল মোবাইল অ্যাকসেসরিজের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে চার্জার, ব্যাটারি, কভার, ইয়ারফোন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ কিনে নিয়ে যেতেন।
তবে বর্তমানে অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করায় অ্যাকসেসরিজ ব্যবসার গুরুত্ব কিছুটা কমেছে।
ফলে এখন অধিকাংশ দোকানের প্রধান আয়ের উৎস মোবাইল সার্ভিসিং ও যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন।
কোন সমস্যাই সবচেয়ে বেশি আসে?
মার্কেটের টেকনিশিয়ানদের তথ্য অনুযায়ী—
প্রায় ৭০ শতাংশ সমস্যা ডিসপ্লে সংক্রান্ত
এরপর রয়েছে চার্জিং সমস্যা
ব্যাটারি নষ্ট হওয়া
মাদারবোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
সফটওয়্যার সমস্যা
ক্যামেরা ও স্পিকার বিকল হওয়া
অনেক সময় পানিতে পড়ে যাওয়া কিংবা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার ফলে সূক্ষ্ম আইসি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব জটিল সমস্যাও বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে মেরামত করা হয়।
মাত্র ২০০ টাকা থেকেই শুরু সার্ভিস
পাতাল মার্কেটের অন্যতম আকর্ষণ হলো তুলনামূলক কম খরচে উন্নতমানের সেবা।
এখানে—
সাধারণ সার্ভিস চার্জ শুরু হয় ২০০ টাকা থেকে।
সমস্যার ধরন অনুযায়ী খরচ বাড়ে।
উন্নতমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করলে খরচ কিছুটা বেশি হয়।
প্রয়োজন হলে গ্রাহকের অনুমতি নিয়েই যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়।
অচল ফোনও এখানে মূল্যবান
যেসব মোবাইল ফোন আর সচল করা সম্ভব হয় না, সেগুলোও পুরোপুরি মূল্যহীন হয়ে যায় না।
গ্রাহক চাইলে অচল ফোন বিক্রি করে দিতে পারেন। এরপর সেই ফোনের সচল যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ফোন মেরামতে ব্যবহার করা হয়। ফলে ইলেকট্রনিক বর্জ্য কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই মার্কেট।
ব্যবহৃত হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি
মোবাইল মেরামতে এখানে ব্যবহৃত হয়—
ডিজিটাল মাইক্রোস্কোপ
হট এয়ার গান
পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট
সোল্ডারিং স্টেশন
আইসি রিবলিং মেশিন
হেয়ার ড্রায়ার
মাল্টিমিটার
ডিসপ্লে সেপারেটর
ইউভি ল্যাম্পসহ আরও আধুনিক সরঞ্জাম।
এসব যন্ত্রের সাহায্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সার্কিট পর্যায়ে কাজ করা সম্ভব হয়।
গ্রাহকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে মোবাইল মেরামতের সময় কয়েকটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত—
অস্বাভাবিক কম খরচের লোভে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
ডিসপ্লে লাগানোর আগে অবশ্যই পরীক্ষা করে নিন।
অতিরিক্ত মোটা স্ক্রিন প্রটেক্টর ব্যবহার করবেন না।
বিশ্বস্ত দোকান থেকেই যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করুন।
মেরামতের পর ওয়ারেন্টি সম্পর্কে জেনে নিন।
দীর্ঘদিন মোবাইল ভালো রাখতে যা করবেন
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ পরামর্শ দিয়েছেন—
মোবাইল যেন হাত থেকে না পড়ে।
পানি থেকে নিরাপদে রাখুন, ওয়াটারপ্রুফ লেখা থাকলেও সতর্ক থাকুন।
সবসময় অরিজিনাল চার্জার ব্যবহার করুন।
নিম্নমানের ব্যাটারি বা চার্জার ব্যবহার করবেন না।
ভালো মানের ডেটা কেবল ও অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করুন।
অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ফোন দীর্ঘসময় ব্যবহার না করাই ভালো।
প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতির নীরব অবদান
গুলিস্তানের পাতাল মার্কেট শুধু একটি মোবাইল সার্ভিসিং কেন্দ্র নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন এখানে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, হাজারো মোবাইল ফোন নতুন জীবন পাচ্ছে এবং গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার নতুন ডিভাইস কেনার প্রয়োজন কমে যাচ্ছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় যেখানে স্মার্টফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ, সেখানে প্রায় তিন দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে গুলিস্তানের এই পাতাল মার্কেট। প্রযুক্তি, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অনন্য সমন্বয়ে এটি আজও দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মোবাইল রিপেয়ারিং হাব হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।


0 মন্তব্যসমূহ