সংসদে অর্থমন্ত্রীর তথ্য: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১.৮৮ লাখ কোটি, সরকারের মোট ঋণ ২২ লাখ কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ১২ জুলাই ২০২৬
জাতীয় সংসদে দেশের ব্যাংকিং খাত, সরকারি ঋণ, শেয়ারবাজার, রাজস্ব, মুজিব বর্ষের ব্যয় এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান।
রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা
অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেজে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
এই তালিকায় রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের মোট ঋণ ছাড়িয়েছে ২২ লাখ কোটি টাকা
অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা।
এর মধ্যে—
বৈদেশিক ঋণ: ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা
অভ্যন্তরীণ ঋণ: ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা
তিনি আরও জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার মূলধন এবং ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়েছে।
মুজিব বর্ষে ব্যয় প্রায় ৯৮৩ কোটি টাকা
সংসদে দেওয়া তথ্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি, ভাস্কর্য, বেদি, প্রতিকৃতি, ডিজিটাল কাউন্টডাউন বোর্ড এবং অন্যান্য সরকারি আয়োজন বাস্তবায়নে ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
মোট ৬২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ ব্যয় করেছে।
সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে—
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়: ২৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা
রেলপথ মন্ত্রণালয়: ২০৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়: ১৩৩ কোটি ৩ লাখ টাকা
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র, সংস্কৃতি, প্রতিরক্ষা, সড়ক পরিবহন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, এই ব্যয়ের বিষয়ে এখনো কোনো নিরীক্ষা বা তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আগের সরকারের সময় বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়ের হিসাব সরকার পর্যায়ক্রমে যাচাই করছে এবং সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আমদানি শুল্ক বাবদ বকেয়া ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন বিভিন্ন কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আমদানিকৃত পণ্যের বিপরীতে বকেয়া শুল্ক ও করের পরিমাণ ২৫ হাজার ৫০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
রাজস্ব আদায়ে এই বিপুল বকেয়া আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শেয়ারবাজারে অনিয়মে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জরিমানা
অর্থমন্ত্রী জানান, আগের সরকারের সময় শেয়ারবাজারে কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের শেয়ার লেনদেনসংক্রান্ত কারসাজির ঘটনায় ৪২৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এ ছাড়া বসুন্ধরা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবিজি লিমিটেডের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে ২৫ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তামহা সিকিউরিটিজ, বাংকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ এবং মশিউর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনেও তথ্য পাঠানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, নতুন বিএসইসি দায়িত্ব গ্রহণের পর শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এবং গত দুই মাসে বাজার সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ তহবিল ব্যবস্থাপকরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কঠোর এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ
তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
এই তহবিলের আওতায়—
বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ঋণ,
সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে,
এবং জামানত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
১৪ লাখের বেশি কৃষকের ঋণ পরিশোধ করেছে সরকার
অর্থমন্ত্রী জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় সরকার ইতোমধ্যে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের পক্ষে ব্যাংকের ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
সারসংক্ষেপ
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য দেশের অর্থনীতির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। একদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বিপুল খেলাপি ঋণ, সরকারের ঋণের উচ্চমাত্রা এবং রাজস্ব বকেয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে শেয়ারবাজারে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা এবং কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচি সরকারের সংস্কার ও সহায়তামূলক উদ্যোগের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব পদক্ষেপের কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online


0 মন্তব্যসমূহ