জাপানে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প: ধসে পড়া বিপণিবিতানে আটকা বহু মানুষ, ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে
কুমামোতোতে ভয়াবহ কম্পনে আহত শতাধিক, বিদ্যুৎহীন হাজারো পরিবার; সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার, পরাঘাতের আশঙ্কা অব্যাহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপের কুমামোতো প্রিফেকচারে মঙ্গলবার বিকেলে আঘাত হেনেছে রিখটার স্কেলে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, যা গত দেড় দশকের মধ্যে দেশটির অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভয়াবহ এই কম্পনে একটি বড় বিপণিবিতানের অংশ ধসে পড়েছে, সেখানে বহু মানুষ আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটেছে।
ধসে পড়েছে বিপণিবিতান, নিখোঁজ বহু মানুষ
জাপানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুমামোতোর এইয়ন (AEON) শপিং মল-এর একটি অংশ ভূমিকম্পের পর ধসে পড়ে। ধসের ঠিক আগে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা গ্যাস লিকেজের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, ভবনটির ভেতরে ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী আটকা পড়েছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারে দমকল, সেনাবাহিনী ও বিশেষ উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। নিহতের সংখ্যাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আহত শতাধিক, হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ধসে পড়া ভবনের কংক্রিট, কাচ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের আঘাতে বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী—
শতাধিক মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন,
অন্তত ৫০ জনের বেশি গুরুতর বা মাঝারি ধরনের আঘাত পেয়েছেন,
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী: "এই মুহূর্তে মানুষের জীবন বাঁচানোই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার"
ভূমিকম্পের পরপরই জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।
তিনি বলেন,
"এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা করা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযান সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।"
প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করার আহ্বান জানান এবং আগামী কয়েক দিন শক্তিশালী পরাঘাত (Aftershock) হওয়ার আশঙ্কার বিষয়ে সতর্ক করেন।
সুনামি সতর্কতা জারি, পরে প্রত্যাহার
ভূমিকম্পের পরপরই জাপান আবহাওয়া সংস্থা (JMA) কুমামোতো, নাগাসাকি এবং আরিয়াকে ও ইয়াতসুশিরো সাগর উপকূলের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করে।
তবে সমুদ্রপৃষ্ঠে বড় ধরনের ঢেউ বা অস্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রমাণ না পাওয়ায় প্রায় দুই ঘণ্টা পর সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আপাতত বড় সুনামির ঝুঁকি না থাকলেও উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, রেল ও বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন
ভূমিকম্পে কিউশু অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—
প্রায় ৪৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে,
কিউশু শিনকানসেন (বুলেট ট্রেন) ও স্থানীয় রেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে,
কিছু সড়কে ফাটল এবং সেতুর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে,
কুমামোতো বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব
ভূমিকম্পের কারণে কিউশু অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাজনিত কারণে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, TSMC, Sony, Honda-সহ কয়েকটি বড় কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন স্থগিত করেছে এবং কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
১০০টির বেশি পরাঘাত, ভূমিধসের আশঙ্কা
জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পের পর ইতোমধ্যে ১০০টির বেশি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল কুমামোতো শহরের দক্ষিণে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, ভূ-পৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। অগভীর গভীরতায় সংঘটিত হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং দুর্বল ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকায় স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনায় অস্বাভাবিকতা নেই
ভূমিকম্পের পর জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়নি।
তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
কেন এত ভূমিকম্প হয় জাপানে?
জাপান পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় "রিং অব ফায়ার" অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে প্রশান্ত, ফিলিপাইন, ইউরেশীয় ও উত্তর আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে।
এই কারণে দেশটিতে প্রতিবছর হাজার হাজার ছোট-বড় ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামি এবং ২০১৬ সালের কুমামোতো ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ এখনো জাপানিদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭.১ মাত্রার অগভীর ভূমিকম্প অত্যন্ত বিধ্বংসী হতে পারে, বিশেষ করে যদি এর কেন্দ্রস্থল জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি হয়। যদিও জাপানের আধুনিক ভবনগুলো ভূমিকম্প-সহনশীল প্রযুক্তিতে নির্মিত, তবুও পুরোনো স্থাপনা, বাণিজ্যিক ভবন এবং শিল্পাঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যায়।
উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হওয়ার আগে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংক্ষেপে মূল তথ্য
ভূমিকম্পের মাত্রা: ৭.১ (রিখটার স্কেল)
স্থান: কুমামোতো, কিউশু দ্বীপ, জাপান
সময়: স্থানীয় সময় বিকেল ৪:২৭
প্রধান ক্ষতি: বিপণিবিতানের অংশ ধস, বহু মানুষ আটকা
আহত: শতাধিক (চিকিৎসাধীন বহু ব্যক্তি)
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন: প্রায় ৪৮ হাজার পরিবার
সুনামি সতর্কতা: জারি হলেও পরে প্রত্যাহার
পরিস্থিতি: উদ্ধার অভিযান অব্যাহত, পরাঘাত ও ভূমিধসের ঝুঁকি বহাল
জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে জাপান সরকার।


0 মন্তব্যসমূহ