অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়, ৯ উইকেটে হারিয়ে নতুন ইতিহাস
স্পোর্টস ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ১৬ আগষ্ট ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ৯ উইকেটে হারিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের অন্যতম স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ দল। এক দিনেরও বেশি সময় হাতে রেখেই এসেছে এই জয়। দুই ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে অলআউট করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের হাতে রেখেছিল বাংলাদেশ।
২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রায় নয় বছর পর আবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো। তবে এবারের জয় আরও বিশেষ—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
মিরাজের ঘূর্ণিতে গুটিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৬ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের ব্যাটিং লাইনআপের শেষ অংশ কার্যত একাই ধসিয়ে দেন তিনি।
চতুর্থ দিনের সকালে অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেট হাতে নিয়ে দিনের খেলা শুরু করেছিল। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৪২৬ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া তখনও ৬৭ রানে পিছিয়ে। ইনিংস হার এড়ানোর জন্য তাদের সামনে ছিল কঠিন লড়াই।
কিন্তু মিরাজের নিয়ন্ত্রিত স্পিনে দ্রুতই অস্ট্রেলিয়ার লেজের ব্যাটসম্যানরা সাজঘরে ফিরতে শুরু করেন। প্রথম সেশনে তিনটি উইকেট নেন তিনি। পরে লাঞ্চের পরও নিজের বোলিংয়ে একই শৃঙ্খলা ধরে রাখেন।
বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নকে ফিরিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৫তমবারের মতো পাঁচ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন মিরাজ।
মিরাজের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ধৈর্য। অফ স্টাম্পের বাইরে ফুটমার্কে বল ফেলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের ভুল করার জন্য অপেক্ষা করেছেন। ম্যাচের পরিস্থিতিতে সেটিই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
একাই লড়লেন ক্যামেরন গ্রিন
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে ব্যাটসম্যানরা একে একে ব্যর্থ হলেও এক প্রান্ত আগলে রাখেন ক্যামেরন গ্রিন।
চাপের মুখে অসাধারণ ব্যাটিং করে সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। তাঁর ১০৪ রানের ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়াকে অন্তত ইনিংস ব্যবধানে হার থেকে বাঁচায়। গ্রিন ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে বড় কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি।
তবে গ্রিনের লড়াই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফল বদলাতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
গ্রিনের সেঞ্চুরির পাশাপাশি স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১ এবং ক্যারি ৩০ রান করেন। বাংলাদেশের হয়ে মিরাজ ৫টি এবং হাসান মাহমুদ ৩টি উইকেট নেন। প্রথম ইনিংসেও হাসান মাহমুদ ছয় উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দিয়েছিলেন।
মাত্র ৫৭ রান, তবু শুরুতেই ধাক্কা
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেও বাংলাদেশের শুরুটা পুরোপুরি স্বস্তির ছিল না। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান।
তবে এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক।
সাদমান ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন। অন্যদিকে অভিজ্ঞ মুমিনুল হক ৩০ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জয় এনে দেন। ওয়েবস্টারের বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে জয়সূচক রানটি করেন মুমিনুল।
এরপরই ডারউইনের গ্যালারি জুড়ে শোনা যায়—‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই মারারা স্টেডিয়াম যেন বাংলাদেশের ঘরের মাঠে পরিণত হয়। ড্রেসিংরুমে ক্রিকেটারদের আবেগঘন উদ্যাপনও জানান দেয়, এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কতটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
তানজিদের সেঞ্চুরি, হাসানের আগুনে বোলিং
বাংলাদেশের এই জয়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ম্যাচের প্রথম তিন দিনেই। প্রথম ইনিংসে তানজিদ হাসানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহ গড়ার পথ দেখায়।
নিজের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ১০১ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন তানজিদ। বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে তাঁর ধৈর্য ও পরিণত ব্যাটিং প্রশংসা কুড়ায় অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং ও সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহর কাছ থেকেও।
তানজিদের সেঞ্চুরির ওপর ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে। এরপর হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত পেস বোলিংয়ে মাত্র ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস শেষ হয়ে যায়।
প্রথম ইনিংসে হাসান নেন ৬ উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ৯টি উইকেটই তাঁর শিকার। ফলে ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট, তাতেই ইতিহাস
বাংলাদেশ সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলেছিল ২০০৩ সালে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নেমেই এমন ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জয়টি এসেছে অত্যন্ত কর্তৃত্বপূর্ণভাবে। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অলআউট, বাংলাদেশ ৪২৬। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ করলেও বাংলাদেশের সামনে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য রাখতে পেরেছে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ১ উইকেটে ৫৭ রান করে ৯ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে।
অস্ট্রেলিয়ার গ্যালারি যখন ফাঁকা
চতুর্থ দিনের খেলা হওয়ার আগেই ম্যাচের ফল অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। ফলে ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে দর্শকের উপস্থিতিও ছিল খুব কম।
এমনকি স্টেডিয়ামের বিলাসবহুল ‘প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ’ও ছিল ফাঁকা। সেখানে সাধারণত সাবেক ক্রিকেটার, কর্মকর্তা ও অতিথিদের উপস্থিতিতে পরিবেশ জমজমাট থাকে। কিন্তু চতুর্থ দিনের জন্য কেউ টিকিট না কাটায় লাউঞ্জটি বন্ধই রাখা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকদের অল্পসংখ্যক উপস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের প্রবাসী সমর্থকেরা ছিলেন উচ্ছ্বসিত। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তাঁদের কণ্ঠেই সবচেয়ে বেশি শোনা যায় বাংলাদেশের নাম।
সিরিজে এগিয়ে বাংলাদেশ
এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। অর্থাৎ সিরিজ জয়ের দারুণ সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে।
ডারউইনের এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বিশ্বমানের একটি দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সামর্থ্যের বড় প্রমাণ এটি। তানজিদের ব্যাট, হাসান মাহমুদের পেস এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণি—তিন বিভাগের সম্মিলিত পারফরম্যান্সেই এসেছে এই ঐতিহাসিক সাফল্য।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪ (গ্রিন ১০৪, স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১, ক্যারি ৩০; মিরাজ ৫/৬৬, হাসান ৩/৫৬)
বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ১/৫৭ (মুমিনুল ৩০*, সাদমান ২৫*, তানজিদ ০)
ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী
ম্যাচসেরা: হাসান মাহমুদ
সিরিজ: বাংলাদেশ ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে


0 মন্তব্যসমূহ