তামিলনাড়ুতে কৃষিঋণ মওকুফের সীমা বাড়াল বিজয় সরকার, উপকৃত হবেন আরও ২ লাখ ৩৮ হাজার কৃষক
নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
ভারতের তামিলনাড়ুতে কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও অন্যান্য কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ হাজার রুপি থেকে বাড়িয়ে ৭৫ হাজার রুপি করা হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তে এরই মধ্যে ঋণ মওকুফের সুবিধা পাওয়া কৃষকদের একটি অংশ অতিরিক্ত ঋণ মওকুফের সুযোগ পাবেন।
গত সোমবার তামিলনাড়ু বিধানসভায় ১১০ নম্বর বিধির আওতায় এই ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়। একই দিনে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়। ফলে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমের মধ্যে কৃষকদের জন্য নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অতিরিক্ত ৪০ হাজার রুপি পর্যন্ত ঋণ মওকুফ
মুখ্যমন্ত্রী বিজয় জানিয়েছেন, ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ রুপি পর্যন্ত কৃষিঋণ নেওয়া ২ লাখ ৩৮ হাজার ২৬৪ জন কৃষক নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় আসবেন। এর ফলে যাঁরা আগে নির্ধারিত সীমার মধ্যে ঋণ মওকুফ পেয়েছেন, তাঁরা এবার অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ৪০ হাজার রুপি পর্যন্ত মওকুফ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
নতুন এই সুবিধা বাস্তবায়নে তামিলনাড়ু সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৯৫৩ কোটি ৬ লাখ রুপি।
কৃষকদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ঋণ মওকুফের সীমা বাড়ানোর দাবি ওঠার পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার নিয়ম সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। বিজয় জানান, গত ১৯ জুন কৃষিঋণ মওকুফের নিয়ম সংশোধনের জন্য সরকারি আদেশ জারি করা হয়েছিল।
বিধানসভায় বক্তব্যে তিনি কৃষকদের স্বার্থকে সরকারের অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, তামিলনাড়ুর কৃষকদের কল্যাণের মধ্যেই সরকারের কল্যাণ নিহিত। কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত আর্থিক দায় বহন করতেও তাঁর সরকার প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
প্রায় ১৪ লাখ কৃষক পাবেন সুবিধা
নতুন সিদ্ধান্তটি শুধু অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকার যে সামগ্রিক কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তাতে মোট প্রায় ১৪ লাখ ৪৪ হাজার কৃষক অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন।
এই বিপুলসংখ্যক কৃষকের ঋণ মওকুফে তামিলনাড়ু সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬ হাজার ২২০ কোটি রুপি।
অর্থাৎ কৃষকদের ঋণের চাপ কমাতে রাজ্য সরকার যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তা রাজ্যের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য ঋণের বোঝা কমানো হলে তাঁদের উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং নতুন মৌসুমে কৃষিকাজে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।
কীভাবে পরিশোধ হবে মওকুফের অর্থ
কৃষিঋণ মওকুফের অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী বিজয় জানান, এর আগে কৃষিঋণ মওকুফের অর্থ সরকার কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে সমবায় ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করত।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০২১ সালের কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। ওই কর্মসূচির আওতায় মওকুফ করা অর্থ ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ১২ কিস্তিতে সমবায় ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের ২০২৫ সালের নির্দেশনার পর পরিস্থিতি বদলেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সরকারকে ঋণ মওকুফের অর্থ ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে পুরোপুরি সমবায় ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করতে হবে।
এর ফলে কৃষকদের ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে সমবায় ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতিও দ্রুত স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রায় কৃষকনীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
থালাপতি বিজয় মূলত ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। অভিনয় থেকে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন দল ও জোট সরকার তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
সরকারের ১০০ দিন পূর্তির সময় কৃষকদের জন্য বড় অঙ্কের ঋণ মওকুফের ঘোষণা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কৃষক ও গ্রামীণ ভোটাররা তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। কৃষিঋণের চাপ কমানোর মাধ্যমে বিজয় সরকার একদিকে কৃষকদের আর্থিক স্বস্তি দিতে চাইছে, অন্যদিকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে—এমন বিশ্লেষণও সামনে আসতে পারে।
তবে কৃষিঋণ মওকুফের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের জোগান এবং কৃষকদের ভবিষ্যতে ঋণনির্ভরতা কমাতে কী ধরনের নীতি নেওয়া হচ্ছে তার ওপর।
শুধু ঋণ মওকুফই কি কৃষকের স্থায়ী সমাধান?
কৃষকদের ঋণ মওকুফ তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক চাপ কমাতে পারে। কিন্তু কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানের জন্য উৎপাদন খরচ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সেচব্যবস্থা, বাজারজাতকরণ এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকদের ক্ষেত্রে ঋণ মওকুফের পাশাপাশি সস্তা কৃষিঋণ, উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি, সেচ সুবিধা এবং বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা গেলে কৃষকের আর্থিক স্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে।
বিজয় সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে—ঘোষিত ৬ হাজার ২২০ কোটি রুপির কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচি সময়মতো বাস্তবায়ন করা এবং একই সঙ্গে রাজ্যের আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
সামনে আরও বড় কর্মসূচির ইঙ্গিত
১০০ দিন পূর্তিতে কৃষিঋণ মওকুফের সীমা বাড়ানোর ঘোষণা বিজয় সরকারের কৃষককেন্দ্রিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রায় ১৪ লাখ ৪৪ হাজার কৃষককে কর্মসূচির আওতায় এনে সরকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিমাণ অর্থ প্রবাহের ব্যবস্থা করছে।
তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কৃষকের হাতে বাস্তবে কত দ্রুত সুবিধা পৌঁছায় এবং ভবিষ্যতে তাঁরা আবার ঋণের ভারে পড়ছেন কি না—তার ওপর।
সব মিলিয়ে, তামিলনাড়ু সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে লাখ লাখ কৃষকের ঋণের বোঝা কমবে। একই সঙ্গে এটি থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে।
তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু ও হিন্দুস্তান টাইমস।


0 মন্তব্যসমূহ