শতবর্ষের ইতিহাস পেরিয়ে বঙ্গভবন: ব্রিটিশ আমলের ‘গভর্নমেন্ট হাউস’ থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসভবন
নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের পদচারণায় আবারও আলোচনায় ঐতিহাসিক বঙ্গভবন
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ| ২৩ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হিসেবে পরিচিত বঙ্গভবন শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের স্মৃতি। ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মাণের উদ্যোগ থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের গভর্নর হাউস এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও দপ্তর—সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ভবনটির পরিচয় বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব কখনো কমেনি।
নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নিয়েছেন। শপথের পর আজ রোববার তিনি শতবর্ষের পুরোনো এই রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় আনুষ্ঠানিকভাবে উঠেছেন। তাঁর বঙ্গভবনে ওঠার মধ্য দিয়ে স্থাপনাটির দীর্ঘ ইতিহাস আবারও জনআলোচনায় এসেছে।
বঙ্গভবনের শুরু ব্রিটিশ আমলে
আজকের বঙ্গভবনের ইতিহাসের সূচনা ১৯০৫ সালে। সে বছর ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করে বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করে। এর রাজধানী করা হয় ঢাকা।
নতুন প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রয়োজন হয়। তাঁর জন্য ঢাকায় একটি সরকারি বাসভবন নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রয়োজন থেকেই বর্তমান বঙ্গভবনের জায়গায় নতুন বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার।
পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে ঢাকায় আসেন স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার। তাঁর জন্যই মূলত দিলকুশা এলাকায় নতুন সরকারি বাসভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির ঢাকা কোষ গ্রন্থে বঙ্গভবনের নির্মাণ ও বিকাশের ইতিহাসের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
নবাব পরিবারের সম্পত্তিতে সরকারি ভবন
বঙ্গভবন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি একসময় ঢাকার নবাব পরিবারের সম্পত্তি ছিল। বঙ্গভঙ্গের পর ব্রিটিশ সরকার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য বাসভবন নির্মাণে আগ্রহী হলে নবাব পরিবারের স্যার সলিমুল্লাহ দিলকুশায় তাঁদের পারিবারিক বাগানের একটি অংশ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বাগানবাড়ির দক্ষিণ অংশ ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। সেই অংশের ‘দানা দিঘির ময়দান’ এলাকায় ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯০৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হলেও ভবনটি পুরোপুরি শেষ হয় ১৯১১ সালে। তবে তার আগেই ১৯০৬ সালে লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার নতুন বাসভবনে ওঠেন।
সে সময় ভবনটির নাম ছিল ‘গভর্নমেন্ট হাউস’।
‘টিম্বার প্যালেস’ থেকে গভর্নর হাউস
প্রাথমিক পর্যায়ের ভবনটি ছিল মূলত কাঠের তৈরি। ঢাকা কোষ-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৩ দশমিক ৫ হেক্টর জায়গার ওপর নির্মিত ভবনটির মেঝের আয়তন ছিল ২৫ হাজার ১২৮ বর্গফুট।
সেগুন কাঠের তৈরি মেঝে মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচুতে ছিল। কাঠের এই বিশাল ভবনের কারণে সেটি পরিচিতি পায় ‘টিম্বার প্যালেস’ বা কাঠের রাজপ্রাসাদ নামে।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের আইন পরিষদের সভাও অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অভিজাত ব্যক্তিদের অভ্যর্থনা জানানোর স্থান হিসেবেও ভবনটি ব্যবহৃত হয়েছে।
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে প্রাদেশিক গভর্নরের ঢাকায় অবস্থানের রীতি চালু ছিল। সে সময় দিলকুশার এই গভর্নমেন্ট হাউস গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস পুরোনো কাঠের ভবন
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কাঠের ভবনটির বয়স বাড়তে থাকে। ১৯৬১ সালের একটি ঘূর্ণিঝড়ে পুরোনো কাঠের প্রাসাদটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এরপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের জন্য নতুন বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ভবনের নকশা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় লাহোর থেকে আসা খ্যাতিমান স্থপতি মঈনুদ্দিন চিশতিকে। তৎকালীন গভর্নর আজম খানের ইচ্ছা অনুযায়ী নতুন ভবনের নকশায় ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১৯৬৪ সালের ১৭ জানুয়ারি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়।
নতুন ভবনটি ছিল প্রায় ৮৪ হাজার বর্গফুটের দোতলা স্থাপনা। এতে যুক্ত করা হয় দরবার হল, গভর্নরের শোবার ঘর, দাপ্তরিক কক্ষ এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একাধিক কক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধেও সাক্ষী বঙ্গভবন
বঙ্গভবনের ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও গভীরভাবে যুক্ত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। স্বাধীনতার পর আবারও ভবনটির সংস্কার করা হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর, ২৩ ডিসেম্বর, এই ভবনেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর ভবনটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আবাস ও দপ্তর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখনই এর নাম দেওয়া হয় ‘বঙ্গভবন’।
অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের ‘গভর্নমেন্ট হাউস’ থেকে পাকিস্তান আমলের ‘গভর্নর হাউস’ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ‘বঙ্গভবন’—একটি স্থাপনাই তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক যুগের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছে।
শুধু বাসভবন নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র
স্বাধীনতার পর বঙ্গভবন দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হিসেবে এখানে নিয়মিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, শপথ, বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অভ্যর্থনা এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী ভবনের বিভিন্ন অংশে নতুন কক্ষ ও অবকাঠামো যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের বিভিন্ন চিত্রকর্ম দিয়ে বঙ্গভবনের অভ্যন্তরও সাজানো হয়েছে।
ফলে বঙ্গভবন এখন শুধু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের স্থান নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নতুন রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নতুন অধ্যায়
গত শুক্রবার বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর আজ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গভবনে উঠেছেন।
তাঁর আগমন এই ঐতিহাসিক স্থাপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় আরেকটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে যে ভবন নির্মিত হয়েছিল একজন ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট গভর্নরের বাসভবন হিসেবে, সেই একই স্থাপনা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন ও দপ্তর। এর দেয়াল ও প্রাঙ্গণ পেরিয়ে গেছে ঔপনিবেশিক শাসন, বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদ, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক পালাবদল।
বঙ্গভবনের ইতিহাস তাই কেবল একটি ভবনের ইতিহাস নয়—এটি ঢাকার রাজনৈতিক বিবর্তন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় যাত্রারও এক জীবন্ত দলিল।


0 মন্তব্যসমূহ