৪২ প্রতিষ্ঠানের বিদেশি সম্পদ উদ্ধারে তৎপর ব্যাংক, চুক্তি হচ্ছে ৮ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ৯ আগস্ট ২০২৬
দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা নামে-বেনামে সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আটটি আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে দ্রুত এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ৪২টি প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া ৩৮টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিদেশে সম্পদ উদ্ধারের অগ্রগতি ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের প্রতিষ্ঠান তালিকায়
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো বা সিআইবি ডাটাবেজের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশে সম্পদ থাকার প্রাথমিক তথ্যও পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ ও সাদ মুসা গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান।
তবে বিদেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেলেই তা অবৈধভাবে পাচার করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সম্পদের উৎস, মালিকানা ও অর্থের গতিপথ তদন্তের পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা
বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটসের নাম এসেছে।
ব্যাংকগুলোকে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদের মালিকানা, অবস্থান, প্রকৃতি এবং আনুমানিক আর্থিক মূল্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে উদ্ধার কার্যক্রম
বিদেশে সম্পদ উদ্ধারের এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘নো উইন, নো পে’ নীতি। অর্থাৎ সম্পদ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে হবে না।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থে অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় কাজ পরিচালনা করবে। পরে সম্পদ উদ্ধার হলে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি অংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।
এ পদ্ধতিতে ব্যাংকগুলোর ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদের সন্ধান ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও বাড়বে।
১২ দেশে পাচার করা সম্পদের তথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অর্থ ও সম্পদ থাকার প্রাথমিক তথ্য বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া গেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া।
তবে কোন প্রতিষ্ঠানের কত সম্পদ কোন দেশে রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব তথ্য যাচাই করা হবে।
সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে তা জব্দ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তি করে অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়েও গুরুত্ব
বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগের সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে এবং তা ফেরত আনার জন্য ব্যাংকগুলো কাজ করছে। তাঁর মতে, অর্থ কতটা ফেরত আনা যাবে, সেটি পরের বিষয়; তবে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
তিনি জানান, বিদেশে থাকা অর্থ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ কাজে বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য এসব প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।
সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক তদন্তকারী ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও আর্থিক মূল্য শনাক্তের কাজ করছে।
প্রথম ধাপে সম্পদের অবস্থান ও মালিকানা শনাক্ত করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালতের নির্দেশনার পর সম্পদ বিক্রি বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে—বিদেশে পাচার হওয়া জাতীয় সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বিশেষ করে বড় প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়লে ব্যাংকের তারল্য, মূলধন ও সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় বিদেশে স্থানান্তরিত সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হবে না; অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও আর্থিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা বড় পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে বিদেশ থেকে অর্থ বা সম্পদ ফেরত আনা একটি দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন, আদালতের অনুমোদন, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের মতো বিষয় এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ শুরু হলেও কাঙ্ক্ষিত অর্থ দ্রুত দেশে ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সম্পদের মালিকানা প্রমাণ, অর্থের উৎস শনাক্তকরণ, বিভিন্ন দেশে আইনি পদক্ষেপ এবং আদালতের সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
এ ছাড়া বিদেশে থাকা সম্পদ যদি বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে স্তরবিন্যস্তভাবে রাখা হয়, তাহলে প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করাও কঠিন হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী, ব্যাংক এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবু উদ্যোগটি সফল হলে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য তা একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। বিদেশে থাকা অবৈধভাবে পাচার করা সম্পদ উদ্ধার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু অতীতে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নিলেই হবে না; ভবিষ্যতে যেন ব্যাংকঋণের অর্থ বিদেশে পাচার বা অবৈধভাবে স্থানান্তর করা না যায়, সে জন্যও কঠোর নজরদারি, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।


0 মন্তব্যসমূহ