নেপালে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসে ভয়াবহ বিপর্যয়, নিহত ২৭০; নিখোঁজ ১,৫০০
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ২৭ আগস্ট ২০২৬
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও রয়টার্স
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রাসুয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকায় প্রবল বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ২৭০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ। একই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে ৮০০ জনের বেশি বিদেশি পর্যটক রয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
দুর্যোগে নদীর পানির প্রবল স্রোতে বাড়িঘর ও সড়ক ভেসে গেছে, কোথাও আবার কাদামাটির নিচে চাপা পড়েছে বসতবাড়ি। যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে।
নিখোঁজদের বড় অংশ বিদেশি পর্যটক
নেপালের পর্যটন কর্মকর্তা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজ প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের মধ্যে ৮০০ জনের বেশি বিদেশি পর্যটক।
নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে আগস্টের শেষ দিকে পর্যটকদের যাতায়াত থাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় বিদেশিদের একটি বড় অংশ আটকা পড়েছেন বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, অন্তত ৫৪ জন মার্কিন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
একই সঙ্গে দুর্গত মানুষদের সহায়তায় নেপালকে ৫ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জরুরি আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সরবরাহে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের নাগরিকদেরও খোঁজ নেই
দুর্যোগে বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ জানিয়েছেন, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গেরও বেশ কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির ১০৫ জন নিখোঁজ, যার মধ্যে কলকাতার ৩২ জন রয়েছেন।
ফলে নেপালের স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও উদ্ধারের বিষয়টিও এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাদার নিচে চাপা পড়েছে বাড়িঘর
নেপাল পুলিশের প্রকাশিত ছবি ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার বিভিন্ন দৃশ্যে দুর্যোগের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে।
কোথাও নদীর পানির তীব্র স্রোতে বাড়িঘর ভেসে যেতে দেখা গেছে। কোথাও আবার পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে পুরো এলাকা কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়েছে। কোনো কোনো স্থানে ধসে পড়া বাড়ির শুধু ওপরের অংশটুকু দৃশ্যমান রয়েছে।
উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এক্সকাভেটরসহ ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান চালানো হচ্ছে।
তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কার কারণে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে।
২৮ পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখনো নিখোঁজ শত শত মানুষের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
এতে বোঝা যায়, দুর্যোগের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে নিয়োজিত সদস্যরাও এর বাইরে থাকতে পারেননি।
স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। কারণ ভারী বৃষ্টিপাতের পর পাহাড়ি নদীগুলোর পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে নতুন করে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধাক্কা
প্রাকৃতিক দুর্যোগে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশটির বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জলবিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংকট নয়, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার ও সেনাবাহিনী
দুর্যোগের পর নেপাল সরকার উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। নেপাল সেনাবাহিনী দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠিয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় অনেক রাস্তা কাদা, পাথর ও ভূমিধসে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় দ্রুত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে হেলিকপ্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে আবহাওয়া পরিস্থিতি খারাপ থাকলে আকাশপথেও উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের সীমান্তপথেও প্রভাব
দুর্যোগের প্রভাব নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথেও পড়েছে।
চীনের গিরং সীমান্তপথ নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে পর্যটক ও যানবাহন চলাচলের অন্যতম প্রধান সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র। পাহাড়ি অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের কারণে এই ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পর্যটন, বাণিজ্য ও জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, দুর্যোগটি শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে নয়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে ঘিরে একটি বড় মানবিক ও আঞ্চলিক সংকট হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কেন এত ভয়াবহ হলো দুর্যোগ?
নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি দেশটিকে বন্যা ও ভূমিধসের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পাহাড়ি ঢালে ভারী বৃষ্টিপাত হলে অল্প সময়ের মধ্যে নদী ও খালের পানি দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মাটি দুর্বল হয়ে পাহাড়ের বড় অংশ ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—অনেক সময় সতর্ক হওয়ার জন্য মানুষের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে না। পাহাড়ি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার মধ্যেই বসতি, সড়ক ও সেতু প্লাবিত হতে পারে।
এর সঙ্গে যদি ভূমিধস যুক্ত হয়, তাহলে একই এলাকায় একই সময়ে একাধিক ধরনের দুর্যোগ আঘাত হানে। এতে উদ্ধারপথ বন্ধ হয়ে যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়ে।
প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়
নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
এর অন্যতম কারণ হলো অনেক এলাকা এখনো দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ, কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কত ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—এসব তথ্য সংগ্রহে সময় লাগছে।
উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে নিখোঁজ ১ হাজার ৫০০ মানুষের সন্ধান পাওয়া গেলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে বা কমতে পারে।
সামনে মানবিক সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ
দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নিখোঁজদের উদ্ধার নয়; বরং বেঁচে যাওয়া মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, খাবার, চিকিৎসা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা।
রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় হাসপাতাল ও জরুরি সেবাগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫ লাখ ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি এই মানবিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। পরিস্থিতির মাত্রা আরও স্পষ্ট হলে অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও সহায়তা আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
নেপালের জন্য বড় সতর্কবার্তা
নেপালের এবারের দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিল, পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দুর্যোগ পূর্বাভাস, দ্রুত সতর্কবার্তা, নদীর পানি পর্যবেক্ষণ, পাহাড়ি এলাকার ভূমিধস ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ, সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো দ্রুত সচল করাও জরুরি।
২৭০ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের নিখোঁজ থাকার এই প্রাথমিক হিসাবই বলে দিচ্ছে, নেপালের এবারের বন্যা ও ভূমিধস একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, এই দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র ততই স্পষ্ট হবে।


0 মন্তব্যসমূহ