সৌদির অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭ প্রবাসীর জানাজা একসঙ্গে, কান্নায় ভারী আত্রাই
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ২৮ আগস্ট ২০২৬
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানো ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া আটজনের মরদেহ দেশে এনে দাফন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাত প্রবাসীর জানাজা শুক্রবার সকালে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে আত্রাই উপজেলা সদরের মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাতজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। একসঙ্গে সাতটি খাটিয়া সামনে রেখে জানাজা পড়ানো হয়। মুহূর্তেই কান্না আর শোকে ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
নিহত সাতজন হলেন—উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, কলিমউদ্দিন ইসলাম, মোহন আলী ও তাঁর ছোট ভাই সুমন আলী, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আবদুল জলিল সরকার।
জানাজায় নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
দুই সন্তানকে একসঙ্গে হারিয়ে বাবার আহাজারি
জানাজার আগে পাশাপাশি রাখা হয় সাতজনের মরদেহের খাটিয়া। এর মধ্যে পাশাপাশি ছিলেন সহোদর মোহন আলী ও সুমন আলী।
দুই ছেলেকে একসঙ্গে হারিয়ে তাঁদের বাবা গুফফার প্রামাণিকের কান্না উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমার দুই ছেলে একসঙ্গে চলে গেছে। এটাই হয়তো আল্লাহর ফয়সালা। আপনারা সবাই দোয়া করবেন, তাঁদের ক্ষমা করে দেবেন।”
এই আহাজারিতে জানাজাস্থলের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। স্বজনদের কান্নার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও নেমে আসে শোকের আবহ।
জানাজা শেষে সাতজনের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
একসঙ্গে দেশে ফিরল নয় মরদেহ
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয় বাংলাদেশির মরদেহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
নয়জনের মধ্যে ছিলেন আত্রাইয়ের সাতজন, নাটোরের নলডাঙ্গার রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি।
এরপর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হলে নিজ নিজ এলাকায় নেওয়া হয়। শুক্রবার সকালে আত্রাইয়ে সাতজনের জানাজা ও বাগমারায় শ্যামল উদ্দিনের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়।
বাগমারায় শ্যামলের বাড়িতে শোকের মাতম
একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্যামল উদ্দিন মাঝির মরদেহ শুক্রবার ভোরে তাঁর নিজ গ্রাম মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়ায় পৌঁছায়।
শ্যামল উদ্দিনের বয়স হয়েছিল ৪৬ বছর। সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ে রয়েছে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। বাড়ির বারান্দায় বসে ছিলেন শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন। পাশে থাকা নারীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের উপস্থিতিতে কফিন খোলা হলে স্বজনেরা পোড়া মুখ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। বাবার মরদেহ দেখতে গিয়ে তাঁর ছোট মেয়েও ভেতরে যেতে পারেনি।
শ্যামলের শাশুড়ি মোমেনা বেগম লাঠিতে ভর করে মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ভাইয়ের কফিন ধরে কাঁদছিলেন শ্যামলের বড় বোন হালিমা খাতুনও।
স্বজনদের শোকের পাশাপাশি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে শ্যামলের রেখে যাওয়া তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে—এসব নিয়েও পরিবারটি দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
৯ আগস্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন।
আগুনের ভয়াবহতায় নিহতদের অনেকের মরদেহ গুরুতরভাবে পুড়ে যায়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পরে সৌদি কর্তৃপক্ষ আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে নয়জনের পরিচয় শনাক্ত করে। তাঁদের মধ্যে আটজনের মরদেহ ইতিমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় দাফন করা হয়েছে।
তবে এখনো সাত বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে।
‘শেষবারের মতো ছেলেকে একনজর দেখতে চাই’
পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় নিহতদের কয়েকটি পরিবার এখনো অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের মিনহাজের মা পারুল বিবি তাঁর ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, তাঁর ছেলের মরদেহ এখনো শনাক্ত হয়নি। শেষবারের মতো ছেলেকে একনজর দেখতে চান তিনি।
স্বজনদের এই অপেক্ষা শুধু একটি মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা নয়; এটি প্রিয়জনের মৃত্যুর বাস্তবতা মেনে নিয়ে শেষবারের মতো তাঁকে বিদায় জানানোর আকাঙ্ক্ষা।
দ্রুত মরদেহ ফেরানোর দাবি স্বজনদের
নিহতদের স্বজনেরা দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা স্বজনের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর অন্তত শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখে জানাজা ও দাফনের সুযোগটুকু পাওয়া পরিবারের অধিকার।
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর বাকি ছয় বাসিন্দার পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, এখনো নওগাঁর কয়েকটি পরিবার তাঁদের প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে।
পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দাবি
স্বজনদের শোকের পাশাপাশি নিহতদের পরিবারগুলোর সামনে এখন কঠিন আর্থিক বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য অনেক শ্রমিককে ঋণ করতে হয়েছিল। তাঁদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করত পুরো পরিবার।
বাগমারার শ্যামল উদ্দিনের পরিবারও এর বাইরে নয়। আট বছর আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে যাওয়া শ্যামল সংসারের আর্থিক সংকট কাটাতে কাজ করছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে স্ত্রী ও তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনেরা নিহতদের পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করার আহ্বানও জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান দীর্ঘদিনের। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক সেখানে বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে যান। তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু কর্মস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা, আবাসন ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আসে।
রিয়াদের এই অগ্নিকাণ্ডে একই সঙ্গে ১৬ বাংলাদেশির প্রাণহানি সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনার পর পরিচয় শনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগায় মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরানো এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
শেষ বিদায়ে মিলল স্বজনদের সান্ত্বনা
আত্রাইয়ের সাত পরিবার এবং বাগমারার শ্যামল উদ্দিনের পরিবারের কাছে প্রিয়জনকে হারানোর শোক কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অন্তত মরদেহ দেশে ফিরে আসায় তাঁরা শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে নিজেদের মাটিতে দাফন করার সুযোগ পেয়েছেন।
আত্রাইয়ে পাশাপাশি সাতটি খাটিয়া, দুই ভাইকে হারানো বাবার কান্না আর বাগমারায় স্ত্রী-সন্তানদের আহাজারি—রিয়াদের সেই অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতারই নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকল।
এখন অপেক্ষা শুধু বাকি সাত বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত হওয়ার। স্বজনদের আকুতি—দ্রুত তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা হোক, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াক সরকার।


0 মন্তব্যসমূহ