নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস: নিহত অন্তত ৬২৩, নিখোঁজ ২,৪২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পকেট নিউজ | ২৯ আগস্ট ২০২৬
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসের পর ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়েছে। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভোটেকোশি নদীর প্রলয়ংকরী স্রোতে বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও উদ্ধারকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগকবলিত নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ৬২৩টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২ হাজার ৪২৬ জনে।
তবে নিখোঁজ ও নিহতের সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয়। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকা, দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং নদীর স্রোতে মরদেহ দূরবর্তী এলাকায় ভেসে যাওয়ার কারণে সামনে হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকাও অস্বাভাবিক নয়।
নেপালে নিখোঁজ ১,৯২৪
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির সীমান্তবর্তী দুর্যোগকবলিত এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে, নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে পর্যটক ছাড়াও বিদেশি শ্রমিক থাকতে পারেন।
নেপালের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে না পারায় প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
তিব্বতে নিখোঁজ আরও ৫৫৪
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অংশে ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে এখন পর্যন্ত ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
চীনা কর্মকর্তাদের হিসাবে তিব্বত অংশে নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপাল ও তিব্বতের তথ্য একত্র করলে দুর্যোগকবলিত পুরো অঞ্চলে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ২ হাজার ৪২৬ জন।
গত বৃহস্পতিবারের তুলনায় এই সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি বেড়েছে। উদ্ধার অভিযান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য সামনে আসায় সংখ্যাটিতে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
৬২৩ মরদেহ উদ্ধার
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা আগে জানিয়েছিল, দেশটিতে অন্তত ৫৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চীনের তিব্বত অংশে আরও সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
এরপর উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, তারা মোট ৬২৩টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
তবে উদ্ধার হওয়া সব মরদেহের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ভয়াবহ স্রোতে মরদেহ ভেসে গিয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও পৌঁছে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ কারণে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে আরও সময় লাগবে।
শত শত বিদেশি এখনো নিখোঁজ
এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। পর্যটন মৌসুমে পাহাড়ি অঞ্চলে বিদেশি পর্যটক ও বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের উপস্থিতির কারণে তাঁদের একটি বড় অংশ দুর্যোগের মধ্যে পড়ে থাকতে পারেন।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ও পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুধু নেপালেই শত শত বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, মোট ৬২২ জন পর্যটকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের মধ্যে ৪৭৩ জন বিদেশি পর্যটক। এ ছাড়া ১২১ জন পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে দুর্যোগকবলিত এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদেশি শ্রমিকসহ মোট কত মানুষ উদ্ধার হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
নেপালি নাগরিকও নিখোঁজ
দুর্যোগের শিকার শুধু বিদেশিরা নন। বিপুলসংখ্যক নেপালি নাগরিকও এখনো নিখোঁজ।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাবে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা ৬২২ পর্যটকের মধ্যে ১৪৯ জন নেপালি। তবে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এ সংখ্যা ১২৭ জন বলে জানিয়েছে।
দুই সংস্থার হিসাবে পার্থক্য থাকলেও স্থানীয় নেপালি নাগরিকদের একটি বড় অংশ যে এখনো নিখোঁজ, তা স্পষ্ট।
এ ছাড়া পর্যটক তালিকার বাইরে দুর্যোগকবলিত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কতজন নিখোঁজ, তা এখনো নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তাঁদের সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কোন দেশের কত নাগরিক নিখোঁজ?
নেপাল পর্যটন বোর্ড ও বিভিন্ন দেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
চীন: নেপালে প্রায় ১০০ জন চীনা নাগরিক নিখোঁজ থাকার তথ্য চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে নেপাল পর্যটন বোর্ডের তালিকায় নিখোঁজ চীনা নাগরিকের সংখ্যা আটজন এবং উদ্ধার ১৬ জন। তিব্বত অংশে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ২৬০ জনের জাতীয়তা এখনো বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ভারত: নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাবে ৯৮ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ এবং ৮৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ৯০ জন মার্কিন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন এবং তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাবে নিখোঁজ মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা ৬৫।
ইউক্রেন: নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাবে ৬১ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক নিখোঁজ। ইউক্রেনের দূতাবাসের হিসাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নাগরিকের সংখ্যা ৬২।
মালয়েশিয়া: নিখোঁজ রয়েছেন ৫১ জন।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়ার সহকারী অভিবাসনমন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েট জানিয়েছেন, নিখোঁজ অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সংখ্যা বেড়ে ৪১ জনে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাজ্য: ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক নিখোঁজ বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড।
লাটভিয়া: নিখোঁজ ২৯ জন।
কানাডা: নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাবে ২৫ জন কানাডীয় নাগরিক নিখোঁজ। তবে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে সংখ্যা ৩০ জন বলেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: ৯ জন নাগরিক নিখোঁজ। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নয়জন কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের ৯ জন, জার্মানির ৮ জন, রাশিয়ার ৯ জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ৬ জন, জাপানের ৫ জন, নিউজিল্যান্ডের ৫ জন, ফ্রান্সের ৪ জন, স্পেনের ৩ জন, হাঙ্গেরির কয়েকজন, কাজাখস্তানের ৩ জন, আয়ারল্যান্ডের ২ জনসহ আরও বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
কিছু দেশের ক্ষেত্রে দেশটির নিজস্ব সরকারি হিসাব এবং নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে নেপালের সেনাবাহিনী
ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপালের সেনাবাহিনী ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের সন্ধানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।
নুয়াকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা ধ্বংসস্তূপ, নদীর তীর ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় তল্লাশি চালাচ্ছেন। উদ্ধারকাজের সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ অসহায় মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গসহ দুর্গম স্থানে আটকে পড়া ব্যক্তিদেরও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
তবে নতুন করে ভূমিধস, প্রবল স্রোত ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকারীদের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে।
স্বজনদের অপেক্ষা, বাড়ছে উৎকণ্ঠা
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা বিভিন্ন উদ্ধারকেন্দ্র ও হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন। কেউ কয়েক ঘণ্টা পর প্রিয়জনের খবর পেয়েছেন, আবার কেউ এখনো কোনো তথ্য পাননি।
নুয়াকোটের ত্রিশূলী ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। তাঁদের অনেকেই উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা ও শনাক্ত হওয়া মরদেহের তালিকায় প্রিয়জনের নাম খুঁজছেন।
বন্যার পানিতে ভেসে আসা মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেগুলো সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করাও নেপালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
কেন বদলে যাচ্ছে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা?
দুর্যোগের পর হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, পাহাড়ি এলাকার অনেক অংশে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বহু মানুষ তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তৃতীয়ত, নদীর প্রবল স্রোতে মানুষ ও মরদেহ দূরের এলাকায় ভেসে যেতে পারে।
এ ছাড়া নেপাল ও চীনের বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। পর্যটন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের তথ্যের মধ্যে সময় ও পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকায় একই ব্যক্তিকে নিয়ে ভিন্ন সংখ্যা দেখা যাচ্ছে।
ফলে এখনকার সংখ্যাগুলোকে প্রাথমিক হিসাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামনে আরও বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ
নিখোঁজদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি দুর্গত মানুষদের খাবার, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয় নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল না থাকায় নিখোঁজদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার অভিযান যত দ্রুত সম্ভব দুর্গম এলাকায় সম্প্রসারণ করা এবং নিখোঁজদের তথ্য একক সমন্বিত ডাটাবেজে আনা গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দ্রুত পরিষ্কার হবে।
সংখ্যাগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই দুর্যোগে অন্তত ৬২৩টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে এবং ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রের সর্বশেষ হিসাবে জানা যাচ্ছে। তবে এগুলো চূড়ান্ত সংখ্যা নয়।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় নতুন মরদেহ ও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান মিলতে পারে। একই সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা অনেক মানুষ নিরাপদে থাকলেও এখনো তাঁদের খবর পাওয়া যায়নি—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।
তাই নেপাল-তিব্বত অঞ্চলের এই ভয়াবহ দুর্যোগের প্রকৃত মানবিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পুরোপুরি জানতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা, মরদেহ দ্রুত শনাক্তকরণ এবং দুর্গত মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা।


0 মন্তব্যসমূহ