নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে নতুন অধ্যায়: ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় চালু হলো ‘পিংক বাস’
নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। প্রাথমিক পর্যায়ে তিন শহরের ১৩টি পথে ১৪টি বাস চলবে। এসব বাসের চালক, সহকারী ও ভাড়া সংগ্রহকারী হবেন নারী এবং যাত্রীও থাকবেন শুধু নারী। দীর্ঘদিন ধরে গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা, হয়রানি ও আসনসংকটের যে সমস্যাগুলো আলোচিত হয়ে আসছে, সেগুলো মোকাবিলায় নতুন এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’ উদ্বোধন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে এই সেবা আরও বিস্তৃত করা হবে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
নিরাপদ যাতায়াতই মূল লক্ষ্য
বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাতায়ান দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত ভিড়, আসনের স্বল্পতা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, হয়রানি এবং অনেক ক্ষেত্রে বাসে ওঠা-নামার সময় নিরাপত্তাহীনতা—এসব কারণে নারী যাত্রীদের একটি অংশ নিয়মিত গণপরিবহন ব্যবহারে অস্বস্তি বোধ করেন।
নতুন পিংক বাস সার্ভিসের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নারীদের জন্য এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে বাসে ওঠা থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত তারা তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ পাবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, নারীদের পরিচালনায় বিশেষ বাস চালু করা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়, বাসের ভেতরে এবং বাস থেকে নামার পর—তিন পর্যায়েই নারীদের বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৩ পথে ১৪ বাস, থামবে ১৩৪ স্থানে
প্রাথমিকভাবে ঢাকার ১০টি রুটে ১০টি বাস, বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি বাস এবং চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি বাস চালু হয়েছে। অর্থাৎ তিন শহরে মোট ১৩টি রুটে ১৪টি বাস চলাচল করবে।
বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী, এসব রুটে মোট ১৩৪টি স্থানে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ থাকবে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১২টি এবং বগুড়ায় ১৬টি স্থান রয়েছে।
ঢাকার রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে—নতুন বাজার-কোকাকোলা থেকে মতিঝিল, তালতলা থেকে মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে জিপিও, মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল, মিরপুর থেকে মতিঝিল, মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা, মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল, আবদুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল এবং গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর।
চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে এবং বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি ও বনানী-মোকামতলা রুটে এই বাস চলবে।
এভাবে নতুন সেবাটি শুধু রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; ঢাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এবং দেশের দুটি বড় শহরকেও প্রাথমিক পর্যায়ে এর আওতায় আনা হয়েছে।
নারী চালকের হাতে গণপরিবহনের স্টিয়ারিং
পিংক বাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো—এগুলো পরিচালনায় নারীদের সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে।
চালকদের একজন মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন। তিনি উচ্চশিক্ষিত এবং বিআরটিসিতে ছোট যানবাহন চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বাস চালানোর সিদ্ধান্তের শুরুতে পরিবার থেকে আপত্তি এলেও তিনি পিছিয়ে যাননি। তাঁর বক্তব্য, সমাজে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নারীরাও যেকোনো পেশায় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন।
আরেক চালক জান্নাতুল ফেরদৌসীও নতুন এই উদ্যোগের অংশ হয়েছেন। নারীদের বাস চালানোর এই উদ্যোগ একদিকে যেমন নিরাপদ পরিবহনের সুযোগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে গণপরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থান ও অংশগ্রহণের নতুন দরজাও খুলছে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, শুধু নারী যাত্রীদের জন্য বাস চালু করলেই নারীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা তৈরি হয় না; পরিবহন খাতের বিভিন্ন দায়িত্বে নারীদের যুক্ত করাও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
যাত্রীদের প্রত্যাশা—শুধু বাস চালু নয়, নিয়মিত সেবাও
উদ্বোধনের দিন নারী যাত্রীদের মধ্যে পিংক বাস নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন, নিয়মিত গণপরিবহনে ভিড়ের কারণে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
একজন শিক্ষার্থী বলেন, নারী পরিচালিত বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় নিরাপত্তাহীনতার ভয় অনেকটাই কমবে। তবে তিনি শুধু ঢাকার মধ্যে নয়, ঢাকার বাইরেও এই সেবা সম্প্রসারণের দাবি জানান।
আরেক যাত্রী বলেন, নারী বাসে চলাচল করলে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা কমবে বলে তিনি আশা করছেন। একই সঙ্গে বাসের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এখানেই নতুন এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হবে। কারণ, শুধু উদ্বোধনী পর্যায়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে নির্ধারিত সময়ে বাস পাওয়া, পর্যাপ্ত সংখ্যক বাস চালানো এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার ব্যবস্থাও থাকছে
পিংক বাস সার্ভিসকে শুধু নারী চালক ও নারী যাত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও রাখা হয়েছে।
বিআরটিসি জানিয়েছে, প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) থাকবে। ফলে বাসের অবস্থান ও চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে তিনটি বাসে ক্লোজড-সার্কিট ক্যামেরা বা সিসিটিভি সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাসে এই সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বাস, ডিপো ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করা হবে। চালু করা হয়েছে ই-টিকিট ব্যবস্থাও।
এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও বাড়তে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা কতটা নেওয়া হয়েছে?
বাংলাদেশে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিসের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। বিআরটিসি পরীক্ষামূলকভাবে ১৯৯৮ সালে মহিলা বাস সার্ভিস চালু করেছিল। পরে নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবা চালু করা হয়।
তখন মোট ১২টি বাস থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়মিতভাবে রাস্তায় চলাচল করত অল্পসংখ্যক বাস। নারী যাত্রীদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বাস পাওয়া যেত না। কিছু বাস বেসরকারিভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল এবং সেসব বাসের চালক ছিলেন পুরুষ।
২০০৯ সালে আবার এই সেবা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে এবার পিংক বাস সার্ভিস চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আগের ব্যর্থতার কারণগুলো পুনরাবৃত্তি না করা।
নারী যাত্রীদের বক্তব্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁদের মতে, বাস সার্ভিস চালু করার পাশাপাশি নিয়মিত পরিচালনা, পর্যাপ্ত বাস, ভালো ব্যবস্থাপনা এবং নির্ধারিত সময়ে বাস পাওয়ার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫০ বাসের লক্ষ্য, আসছে ২০০ ইভি বাস
সরকারের পরিকল্পনা শুধু বর্তমান ১৪টি বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিআরটিসি।
এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ২০০টি ইলেকট্রিক বাস (ইভি) আসার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। এর মধ্যে ১০০টি বাস নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিভাগেও নারী বাস সার্ভিস চালু করার কথা বলা হয়েছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পিংক বাস একটি সীমিত পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।
উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনার ওপর
পিংক বাস চালুর ফলে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহনের একটি বিকল্প তৈরি হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চালক ও সহকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সিসিটিভি ও ভিটিএসের মতো প্রযুক্তি শুধু সংযোজন করলেই হবে না, এগুলোর কার্যকর মনিটরিংও প্রয়োজন।
চতুর্থত, যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। পঞ্চমত, রুট ও বাসের সংখ্যা এমনভাবে বাড়াতে হবে, যাতে এটি কেবল প্রতীকী উদ্যোগ হয়ে না থাকে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—নারীদের নিরাপদ যাতায়ানের জন্য আলাদা বাস প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুরো গণপরিবহনব্যবস্থাকেই নারীবান্ধব ও নিরাপদ করে তোলা জরুরি।
শেষ কথা
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় পিংক বাস সার্ভিস চালু হওয়া নারীদের গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নারী চালক, নারী সহকারী, নারী যাত্রী এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা—এই চারটি উপাদান উদ্যোগটিকে আগের মহিলা বাস সার্ভিসের তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, উদ্বোধনের পর নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত বাস, সময়ানুবর্তিতা, রুট সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং যাত্রীদের আস্থা ধরে রাখতে পারলে পিংক বাস কেবল একটি বিশেষ বাস সার্ভিস থাকবে না; বরং বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ চলাচলের একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ের ১৩ রুট এক নজরে:
ঢাকায়—নতুন বাজার–মতিঝিল, তালতলা–মতিঝিল, ডেমরা–জিপিও, মিরপুর-১০–মতিঝিল, মিরপুর–মতিঝিল, মিরপুর-১২–মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা, মোহাম্মদপুর–মতিঝিল, আবদুল্লাহপুর–মতিঝিল এবং গাজীপুর–বিমানবন্দর।
বগুড়ায়—শেরপুর–মাটিডালি ও বনানী–মোকামতলা।
চট্টগ্রামে—কালুরঘাট–পতেঙ্গা।


0 মন্তব্যসমূহ