জঙ্গল সলিমপুরে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েও প্রশ্ন, বিদ্যুৎ-পানি এখনো স্থানীয় নিয়ন্ত্রণে
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও এলাকাটির ওপর প্রশাসনের বাস্তব ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মার্চে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। বসানো হয় তল্লাশিচৌকি, স্থাপন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প। কিন্তু কয়েক মাস পরও বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সেবা—বিদ্যুৎ ও পানি—অনেকাংশে রয়ে গেছে স্থানীয় গোষ্ঠী ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি সরেজমিনে পাওয়া তথ্য বলছে, জঙ্গল সলিমপুরে বৈধ সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগের সংখ্যা মাত্র ২২টি। এসব সংযোগ থেকে বিভিন্ন শাখা লাইন ছড়িয়ে বসতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু কোন সংযোগ বৈধ, কোনটি অবৈধ, কারা বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহ করছে এবং সংগৃহীত অর্থের কতটা সরকারি হিসাবে জমা পড়ছে—এসব বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছেও পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।
এদিকে পানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র। গভীর নলকূপ, পাম্প, জলাধার ও স্থানীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহ করা হলেও এসব ব্যবস্থার মালিকানা, পরিচালনা ও অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত হিসাব নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা এবং পানির সরবরাহ লাইনে বিষাক্ত পদার্থ মেশানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—শুধু অস্ত্রধারীদের প্রকাশ্য উপস্থিতি কমে যাওয়া বা প্রবেশপথে পুলিশি তল্লাশি বসানোই কি একটি এলাকার ওপর পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ, নাকি নাগরিক সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা জরুরি?
যৌথ অভিযানের পর বদলেছে দৃশ্যপট, কাটেনি ভয়
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সীতাকুণ্ডের অন্যতম আলোচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও বিভিন্ন সময়ের প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, পাহাড় কেটে সেখানে অবৈধ বসতি, প্লট ও স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। বহিরাগতদের প্রবেশেও ছিল নানা ধরনের বাধা।
পরিস্থিতি বদলাতে গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৩ হাজার ১৭৩ সদস্য নিয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় আগ্নেয়াস্ত্র, পাইপগান, গুলি, ককটেল, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম এবং নজরদারিতে ব্যবহৃত সিসি ক্যামেরা।
এরপর জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি এবং এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয় এলাকায় দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল, সব বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রাণহানি ছাড়াই জঙ্গল সলিমপুর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো সেই দাবির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের’ পরও ক্যাম্পে হামলা
যৌথ অভিযানের পরও ২৪ মে দিবাগত রাতে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ঠেকাতে কয়েকটি স্থানে রাস্তা কেটে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, প্রকাশ্যে সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কমে এলেও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
এলাকার বাসিন্দাদের একটি অংশের আশঙ্কা, কথিত নিয়ন্ত্রক মো. ইয়াসিন ও তাঁর সহযোগীদের পুরোপুরি গ্রেপ্তার করা না গেলে ভবিষ্যতে তারা আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী অনেক পরিবার উচ্ছেদের আশঙ্কাতেও রয়েছে।
তাঁদের দাবি, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে আগে বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারি বিদ্যুৎ নয়, বিল যায় স্থানীয় সংগঠনের কাছে
জঙ্গল সলিমপুরের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পুরো এলাকায় বৈধ মূল সংযোগ মাত্র ২২টি। কিন্তু এসব মূল সংযোগ থেকে অসংখ্য সাবলাইন বা শাখা লাইন বিভিন্ন বসতিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ফলে একজন সাধারণ বাসিন্দা বা দোকানদার বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও তাঁর হাতে সরকারি বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়মিত বিল পৌঁছাচ্ছে না। বরং স্থানীয় একটি সংগঠনের রসিদে বিল দেওয়া হচ্ছে এবং সংগঠনের নির্দিষ্ট কার্যালয়ে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যে এলাকায় প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে নাগরিকদের বিদ্যুৎ বিল কেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে আদায় হবে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের জন্য নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থের পুরোটা বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে জমা পড়েনি। এর ফলে বকেয়া জমতে জমতে একপর্যায়ে প্রায় ৭২ লাখ টাকাতে পৌঁছায়।
পরে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি থাকে ২৮ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় পরবর্তী সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।
এত বিপুল বকেয়া কীভাবে তৈরি হলো এবং বাসিন্দাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের পরও সেই অর্থ কোথায় গেল—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই সমাধান নয়
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। কারণ ২২টি মূল সংযোগের সঙ্গে শুধু সাধারণ বসতিই নয়, পুলিশ ক্যাম্প, পানির পাম্প ও সরকারি কার্যক্রমও কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।
ফলে সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনগণের জরুরি সেবাও ব্যাহত হতে পারে।
এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বৈধ ও অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছেন। যাচাই শেষে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিতে সমস্যাটির সমাধান শুধু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয় বিলিং ব্যবস্থা, গ্রাহকের সঠিক তালিকা, মিটারভিত্তিক হিসাব এবং অর্থ আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াকে সরকারি ব্যবস্থার আওতায় আনা।
পানির ব্যবস্থাপনাতেও একই অস্বচ্ছতা
বিদ্যুতের মতো পানির ক্ষেত্রেও জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় নির্ভরশীলতা।
বিভিন্ন গভীর নলকূপ, পাম্প, জলাধার ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পাম্প পরিচালনা, বিদ্যুৎ খরচ ও পাইপলাইন মেরামতের নামে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়।
কিন্তু কোন পাম্প কোথায়, কার মালিকানায়, কোন মিটারে বিদ্যুৎ চলে, কত পরিবার পানি ব্যবহার করে এবং সংগৃহীত অর্থ কার কাছে জমা হয়—এসব তথ্যের সমন্বিত সরকারি হিসাব নেই।
এর ফলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্থানীয় সেবা-অর্থনীতি গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুলিশ ক্যাম্পের পানিতে বিষাক্ত পদার্থ
পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সবচেয়ে গুরুতর উদাহরণ পাওয়া যায় আলীনগরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্পে।
২৬ জুলাই ক্যাম্পে সরবরাহ করা পানিতে অস্বাভাবিক সাদা ফেনা দেখা যায়। পানি পান করে তিন পুলিশ সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তদন্তে পানির সরবরাহ লাইনের একটি অংশ কেটে সেখানে বিষাক্ত বা কীটনাশকজাতীয় পদার্থ মেশানোর প্রাথমিক আলামত পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানায়।
এ ঘটনায় অন্তর্ঘাতমূলক মামলা করা হয়েছে। মামলায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি অপরাধের তদন্তের বিষয় নয়; এটি জঙ্গল সলিমপুরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের গভীরতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ক্যাম্প যদি স্থানীয় উৎসের পানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং সেই সরবরাহ লাইনে সহজে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হয়, তাহলে সেখানে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
পাহাড় কেটে প্লট, তৈরি হয়েছে অবৈধ অর্থনীতির কাঠামো
জঙ্গল সলিমপুরের সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলা বা বিদ্যুৎ-পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূমি দখল ও পাহাড় কাটার অর্থনীতি।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করা হয়েছে। আলীনগরে আড়াই কাঠার একটি প্লট প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং ছোট প্লট প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৬ হাজার ছোট প্লটের মধ্যে ২৩ হাজারের মতো বিক্রি হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব জমির অনেকগুলোর বৈধ সরকারি রেকর্ড বা নিবন্ধিত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে প্লটের দখল ও কেনাবেচা মৌখিক চুক্তি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
অর্থাৎ এখানে শুধু পাহাড় কেটে জমি বিক্রি হয়নি; জমি দখলের পর সেখানে ঘর তৈরি, বিদ্যুৎ সংযোগ, পানি সরবরাহ এবং বিভিন্ন সেবা দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
সরকারি জমির হিসাব নিয়েও বড় প্রশ্ন
জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রশ্নগুলোর একটি সরকারি জমির পরিমাণ।
২০২২ সালের একটি সরকারি সভার কার্যবিবরণীতে জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, এসব সরকারি জমির বড় অংশ পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের দখলে গিয়ে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
কিন্তু কয়েক বছর পর বর্তমান জেলা প্রশাসনের হিসাবে খাসজমির পরিমাণ প্রায় এক হাজার একর।
এই দুই হিসাবের মধ্যে বিশাল পার্থক্য তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আগের হিসাব কি ভুল ছিল, নাকি বর্তমান হিসাবেই কোনো ঘাটতি রয়েছে?
আরও একটি প্রতিবেদনে সরকারি রেকর্ডে জঙ্গল সলিমপুরের ৩ লাখ ১০ হাজার শতক খাস জমির মধ্যে বড় একটি অংশের রেকর্ড-সংক্রান্ত অসামঞ্জস্যের কথা উঠে এসেছে।
সরকারি জমির পরিমাণই যদি পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা না যায়, তাহলে কোন জমি উদ্ধার হবে, কোন জমি সংরক্ষিত থাকবে এবং কোথায় পুনর্বাসন বা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হবে—সেসব সিদ্ধান্তও জটিল হয়ে পড়ে।
নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু ক্যাম্প নয়
জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়।
প্রবেশপথে পুলিশ চৌকি বসানো, নিয়মিত টহল দেওয়া এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রকাশ্য উপস্থিতি কমিয়ে আনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু একটি এলাকায় রাষ্ট্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এর পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর ও নাগরিক সেবাগুলোকেও স্বচ্ছ সরকারি কাঠামোর আওতায় আনতে হয়।
জঙ্গল সলিমপুরে এখনো যদি বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ বিল স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে দিতে হয়, পানি পেতে স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় এবং সরকারি জমির প্রকৃত পরিমাণ নিয়েই যদি ভিন্ন ভিন্ন হিসাব থাকে, তাহলে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটির বাস্তব অর্থ নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্বাসন ও স্থায়ী ব্যবস্থাপনা
জঙ্গল সলিমপুর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বা পাহাড় কাটা বন্ধ করা জরুরি হলেও সেখানে বসবাসকারী সব মানুষকে একই চোখে দেখা যাবে না। বহু পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় বসবাস করছে। তাঁদের মধ্যে কেউ হয়তো অবৈধভাবে জমি দখল করেছেন, আবার কেউ প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ দিয়ে জায়গা কিনে বসতি গড়েছেন।
ফলে উচ্ছেদ অভিযানকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন বাসিন্দাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, জমির মালিকানা যাচাই, অবৈধ দখলের ধরন নির্ধারণ এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করা।
এরপর প্রয়োজন হলে মানবিক ও আইনসম্মত পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে।
একই সঙ্গে পাহাড় কাটা বন্ধ, সরকারি জমির ডিজিটাল জরিপ, অবৈধ প্লটের বাণিজ্য বন্ধ, বিদ্যুৎ-পানি ব্যবস্থার সরকারিীকরণ এবং স্থানীয় অর্থ আদায়ের কাঠামো ভেঙে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
শেষ কথা
জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এনেছে। আগের মতো প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের নিয়ন্ত্রণ বা বহিরাগতদের প্রবেশে কঠোর বাধার চিত্র এখন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, বহু বছরের অবৈধ দখল ও স্থানীয় নিয়ন্ত্রণের কাঠামো এক অভিযানে পুরোপুরি ভেঙে যায়নি।
বিদ্যুৎ বিলের ৭২ লাখ টাকার বকেয়া, স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে বিল আদায়, অনানুষ্ঠানিক পানি সরবরাহ, ক্যাম্পের পানিতে বিষাক্ত পদার্থ মেশানোর অভিযোগ, পাহাড় কেটে প্লট তৈরি এবং সরকারি খাসজমির পরিমাণ নিয়ে অসামঞ্জস্য—সবকিছু মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এখনো প্রশাসনের জন্য একটি বড় ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।
তাই সেখানে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু পুলিশি উপস্থিতি নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হবে—সরকারি জমি কতটা উদ্ধার হলো, অবৈধ দখল কতটা বন্ধ হলো, নাগরিক সেবা কতটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ফিরল এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কতটা ভাঙা গেল।
এই চার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলে জঙ্গল সলিমপুরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দীর্ঘদিনের ‘ছায়া-প্রশাসন’ পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।


0 মন্তব্যসমূহ