সার বিতরণে দেরি, কুড়িগ্রামে গুদামের বেড়া-দরজা ভেঙে সার নিলেন কৃষকেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুড়িগ্রামে সার পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এবার জেলার রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নে সার বিতরণে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে এক ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সকাল ১০টার দিকে বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে এ ঘটনা ঘটে।
ডিলারপক্ষের দাবি, গুদাম থেকে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, উপজেলায় সারের সংকট নেই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু তথ্য ও ভিডিও নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে গুদামে থাকা বাকি সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাত দুইটা থেকে অপেক্ষা, সকালেও শুরু হয়নি সার বিতরণ
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দবেড় বাজারে সার বিতরণের কথা থাকায় রোববার রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকার কৃষক ডিলারের গুদামের সামনে জড়ো হতে থাকেন। অনেকে রাত দুইটার দিকে সেখানে এসে লাইনে দাঁড়ান।
সকাল হওয়ার পরও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গুদামের সামনে কয়েক শ কৃষকের ভিড় জমে যায়। কে আগে সার পাবেন, কতজনকে দেওয়া হবে—এসব নিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনা শুরু হয়।
ডিলারপক্ষের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাইতে যায়। সেই সময়ের মধ্যেই গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে কিছু কৃষক ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সারের বস্তা বের করে নিয়ে যান।
ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে কয়েকজনকে গুদাম থেকে সারের বস্তা বের করে মাথায় ও ভ্যানে করে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
কত বস্তা সার নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, গুদামে প্রায় ৭৫০ বস্তা সার ছিল। সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নিতে সেখানে উপস্থিত হন।
তিনি জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাঁরা প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে যান। এই সুযোগে গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা সার নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে ঠিক কত বস্তা সার নেওয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। গুদামে থাকা অবশিষ্ট সার বিতরণ শেষ করে হিসাব মিলানোর পর প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে বলে ডিলারপক্ষ জানিয়েছে।
অন্যদিকে, রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাওসার আলী বলেছেন, সার বিতরণের সময় পুলিশকে আগে থেকে জানানো হয়নি। পরে কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়।
অর্থাৎ, ঘটনাটিকে ঘিরে ‘শতাধিক বস্তা’ থেকে ‘কয়েক বস্তা’—বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পরিমাণের পার্থক্য রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত হিসাব না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য: উপজেলায় সারের সংকট নেই
রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল আলম বসুনিয়া দাবি করেছেন, উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকেরা ধৈর্য ধরে সার সংগ্রহ করলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা করার কথা জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে কৃষকদের অতিরিক্ত চাপ কমানো এবং অন্যদিকে সার নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে মাঠের পরিস্থিতি বলছে, সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি এবং কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানোর বাস্তবতার মধ্যে কোথাও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কারণ একই সময়ে জেলার একাধিক এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভ, গুদামে ভাঙচুর এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটছে।
ভূরুঙ্গামারীতেও উত্তেজনা, কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ
রৌমারীর ঘটনার পাশাপাশি সোমবার সকালে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলাতেও সার নিয়ে উত্তেজনা দেখা যায়।
সোনাহাট এলাকায় চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কৃষকেরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। পরিস্থিতি দেখতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেখানে গেলে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা তাঁকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিনের ভাষ্য, উপজেলার কোনো না কোনো ইউনিয়নে প্রায় প্রতিদিনই সার নিয়ে কৃষকদের বিক্ষোভ হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধও করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে নিয়মিত মাঠে যেতে হচ্ছে।
পুলিশের এই বক্তব্য থেকে পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—সার বিতরণ নিয়ে অসন্তোষ এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং জেলার একাধিক এলাকায় একই ধরনের উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।
কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক ঘটনা
কুড়িগ্রামে সার নিয়ে উত্তেজনার ঘটনা অবশ্য সোমবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগের দিন নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে সার বিতরণে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে এক পরিবেশকের গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করা হয়।
স্থানীয় কৃষকেরা সেখানে সকাল থেকে অপেক্ষা করছিলেন। দীর্ঘ সময় পরও ডিলারের লোকজন না আসায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে গুদামের বেড়া ভেঙে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সার বিতরণ করা হয়।
এর পাশাপাশি ভূরুঙ্গামারীর বলদিয়া ইউনিয়নের মিলনবাজারেও সার না পেয়ে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে ৪০০ বস্তা সার বরাদ্দ থাকলেও উপস্থিত কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিতরণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল; পরে আরও ২০ টন সার বরাদ্দের কথা জানানো হয়।
২৩ আগস্টের ঘটনাও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
এর আগে গত ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে বিপুল পরিমাণ সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
ওই ঘটনায় ডিলারের বিরুদ্ধে কৃষকদের সময়মতো সার না দেওয়া এবং ক্যাশমেমোতে অসংগতির অভিযোগ উঠেছিল। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কৃষকদের নেওয়া সারের একটি অংশ পরবর্তীতে প্রশাসনের আশ্বাসে ফেরত দেওয়ার কথাও জানা যায়।
ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই জেলায় সার বিতরণকে কেন্দ্র করে একাধিকবার গুদাম ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কৃষকদের উত্তেজনার ঘটনা সামনে এসেছে।
সংকট কি সত্যিই সারস্বল্পতার, নাকি বিতরণ ব্যবস্থার?
কুড়িগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় তাঁরা সার পাচ্ছেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য অনুযায়ী, জেলায় সার মজুত রয়েছে। তবে আগাম ভুট্টা ও বেগুন চাষের জন্য কিছু কৃষক বাড়তি সার সংগ্রহ করে রাখায় কোনো কোনো এলাকায় সাময়িক চাপ তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি সমন্বয়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু মোট মজুতের পরিমাণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কোনো এলাকায় কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কখন ডিলারের কাছে পৌঁছেছে, কখন বিতরণ শুরু হচ্ছে এবং একই সময়ে কত কৃষক সেখানে উপস্থিত হচ্ছেন—এসব বিষয়ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলোতে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—গুদামে সার থাকা এবং কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। বিতরণ ব্যবস্থায় সামান্য বিলম্ব বা তথ্যের ঘাটতিও যখন শত শত কৃষককে এক জায়গায় জড়ো করছে, তখন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তথ্যের স্বচ্ছতা ও আগাম ব্যবস্থাপনা জরুরি
কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ কমাতে শুধু পর্যাপ্ত সার থাকার দাবি যথেষ্ট নয়। কোন ডিলারের কাছে কত বস্তা সার এসেছে, কোন দিন কত কৃষককে সার দেওয়া হবে, জনপ্রতি বা জমির পরিমাণ অনুযায়ী কত সার পাওয়ার কথা—এসব তথ্য আগেভাগে প্রকাশ করা গেলে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমতে পারে।
একই সঙ্গে সার বিতরণের সময় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে ডিলারদের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। কোনো ডিলার পয়েন্টে যদি কয়েক শ বা হাজার কৃষকের উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেখানে আগেই শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার।
কারণ সার কৃষকের জন্য বিলাসী পণ্য নয়; এটি ফসল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ। বীজতলা, চারা রোপণ কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে উপরি প্রয়োগের প্রয়োজন থাকায় কৃষকের কাছে এক দিনের বিলম্বও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
কৃষকের ক্ষোভ যেন সহিংসতায় না গড়ায়
কৃষকের সার পাওয়ার দাবি যৌক্তিক হলেও গুদামের বেড়া বা দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিতরণ ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। এতে একদিকে সরকারি বা ডিলারের সম্পদের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও আরও জটিল হয়ে পড়ে।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সামনে দুটি কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ—একদিকে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, অন্যদিকে গুদাম ভাঙচুর বা জোর করে সার নিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা।
কুড়িগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, শুধু ‘সার পর্যাপ্ত আছে’ বললেই মাঠের অসন্তোষ কমছে না। কৃষকের প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সময়মতো সরবরাহ, সঠিক তথ্য, ডিলার-প্রশাসনের সমন্বয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত বরাদ্দ—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের মত।


0 মন্তব্যসমূহ