সম্পত্তি দান করেও আজীবন ভোগাধিকার, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষায় নতুন আইন
নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সন্তানের নামে বাড়ি, জমি বা অন্য কোনো সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও বৃদ্ধ বাবা-মা সেই সম্পত্তিতে থাকবেন, ব্যবহার করবেন এবং জীবদ্দশা পর্যন্ত ভোগ করবেন—এমন সুযোগকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের সংশোধিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইন। দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর কোনো কোনো বাবা-মায়ের অসহায় হয়ে পড়া, বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়া কিংবা শেষ বয়সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, নতুন আইনের অন্যতম লক্ষ্য সেই ঝুঁকি কমানো।
রোববার জাতীয় সংসদে ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬ পাস হয়। সংশোধনের মাধ্যমে সম্পত্তি দানের একটি নতুন পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে, যেখানে দাতা সম্পত্তি অন্যের নামে দান করলেও নিজের জীবদ্দশার ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। আইনবিদ ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের অনেকে এটিকে প্রবীণ বাবা-মা, বিশেষ করে নারীদের সম্পত্তিগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই এর ধর্মীয় ও আইনগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের কিছু সংসদ সদস্য সংসদে আপত্তি জানিয়েছেন। পরে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন পক্ষ আইনটির কিছু বিধান নিয়ে আপত্তি ও পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছে।
হালিমা বেগমের ঘটনা যে প্রশ্ন সামনে এনেছিল
নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে বরিশালের গৌরনদীর হালিমা বেগমের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
২০২২ সালে ৮২ বছর বয়সী হালিমা বেগমকে তাঁর ছেলে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এর কিছুদিন আগে স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া ৬৪ শতাংশ জমি তিনি ছেলে মাহাবুব আলম মৃধার নামে লিখে দিয়েছিলেন। ফলে ছেলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর ওই সম্পত্তির ওপর নিজের অধিকার দাবি করার সুযোগ তাঁর ছিল না।
এ ধরনের ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—বৃদ্ধ বাবা-মা যদি জীবনের নিরাপত্তা ও সন্তানের ওপর আস্থার কারণে নিজেদের সম্পত্তি সন্তানের নামে লিখে দেন, পরে সেই সম্পত্তি হারিয়ে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়লে তাঁদের সুরক্ষা কোথায়?
নতুন সংশোধিত আইনের জীবনকালীন ভোগাধিকার ব্যবস্থা মূলত এই জায়গাতেই একটি আইনি সুরক্ষা তৈরি করতে চায়।
নতুন আইনে আসলে কী পরিবর্তন হলো?
সংশোধিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন ১২২(ক) ও ১২২(খ) ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি অন্যকে দান করলেও দলিলে নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজের জীবদ্দশা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।
সহজ ভাষায়, একজন বাবা তাঁর বাড়ি বা জমি ছেলের নামে দান করে দিলেন। কিন্তু দানের সময় যদি জীবনকালীন ভোগাধিকার নিজের জন্য সংরক্ষণ করেন, তাহলে সম্পত্তির দান সম্পন্ন হওয়ার পরও তিনি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই বাড়িতে বসবাস বা সম্পত্তি ব্যবহার করার অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।
অর্থাৎ, সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর এবং সম্পত্তি ভোগের অধিকার—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইনটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিকে নতুন বিধান বাতিল বা প্রভাবিত করবে না। বরং জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানকে একটি পৃথক পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
কারা কারা এই সুবিধা পাবেন?
নতুন বিধানের আওতায় নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
বাবা-মা ও সন্তান;
দাদা-দাদি বা নানা-নানি ও নাতি-নাতনি;
সন্তান বা নাতি-নাতনির পক্ষ থেকে বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে সম্পত্তি দান;
স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান।
অর্থাৎ, এটি শুধু বাবা-মায়ের জন্য একতরফা কোনো ব্যবস্থা নয়; নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় দিক থেকেই এই পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
দান করার পর গ্রহীতা মারা গেলে কী হবে?
আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে সেই সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যেতে পারে।
তবে দাতা যে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করেছিলেন, তা তাঁর জীবদ্দশা পর্যন্ত বহাল থাকবে।
অর্থাৎ, সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলেই দাতার সংরক্ষিত ভোগাধিকার শেষ হয়ে যাবে না।
এটি বিশেষ করে এমন বাবা-মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যাঁরা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তান বা নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দিয়ে দিতে চান, কিন্তু নিজেদের বসবাস ও ব্যবহার করার অধিকারও নিরাপদ রাখতে চান।
দান করার পর কি সম্পত্তি আবার ফিরিয়ে নেওয়া যাবে?
সংশোধিত আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্পত্তি নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে দান বাতিল করার সুযোগ থাকবে না।
তবে প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে—যেমন আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত বা পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের মতো নির্ধারিত শর্ত থাকলে—দান বাতিল বা পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর ফলে একদিকে দানকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে দাতার প্রয়োজনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ‘দান করেছি, পরে ভালো লাগছে না’—এমন সাধারণ কারণে সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। অর্থাৎ, দানের আইনি নিশ্চয়তা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত সুরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কেন আইনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—বাড়ি বা জমি—সন্তানের নামে লিখে দেন। এর পেছনে থাকে পারিবারিক আস্থা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার চেষ্টা কিংবা মৃত্যুর পর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এড়ানোর মানসিকতা।
কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেই আস্থার পরিণতি একই হয় না।
কখনো সন্তান বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেন, আবার কখনো সম্পত্তি নিজের নামে পাওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে বৃদ্ধ মা-বাবা অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়লে তাঁদের সামনে খুব কম বিকল্প থাকে।
আইনবিদ ও অধিকারকর্মীদের মতে, নতুন ব্যবস্থা সেই ঝুঁকি কমাতে পারে। কারণ বাবা-মা সম্পত্তি দান করলেও নিজেদের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার আগেই আইনি কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
নারীদের জন্যও কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের পারিবারিক বাস্তবতায় নারীদের একটি বড় অংশ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পত্তির ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত হন। অনেক নারী স্বামীর সম্পত্তি বা নিজের সম্পত্তি সন্তানের নামে দিয়ে দেওয়ার পর শেষ বয়সে সেই সম্পত্তিতে নিজের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
নতুন আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে একজন মা তাঁর সম্পত্তি সন্তানকে দিতে পারবেন, কিন্তু নিজের জীবদ্দশার বসবাস ও ভোগের অধিকারও সংরক্ষণ করতে পারবেন।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, এ কারণে সংশোধনটি শুধু প্রবীণদের সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি নারীর সম্পত্তিগত নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হকের মতে, বাবা-মায়ের পেনশনের টাকা নিয়ে নেওয়া কিংবা সম্পত্তি লিখে নিয়ে তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। তাঁর মতে, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের সুরক্ষার ক্ষেত্রে সংশোধিত আইনটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ধর্মীয় আইন নিয়ে কেন বিতর্ক?
আইনটি পাস হওয়ার পর সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও হেবা ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে।
বিরোধী দলের কিছু সংসদ সদস্য বিলটির বিরোধিতা করেন এবং এটিকে শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেন। পরে জামায়াতে ইসলামী আইনটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়। হেফাজতে ইসলামও আইনটি আরও পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
ধর্মীয় পক্ষগুলোর মূল উদ্বেগ হলো—জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি দানের নতুন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে মুসলিম উত্তরাধিকার বা মিরাসের কাঠামোর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে।
তবে সরকারের ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট আইনবিদদের বক্তব্য হলো, এটি মুসলিম পারিবারিক আইন বা হেবা বাতিল কিংবা সংশোধন করছে না। বরং সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি অতিরিক্ত পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, বিতর্কটির একটি বড় অংশ হলো নতুন বিধানটি বিদ্যমান ধর্মীয় ও আইনগত সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে।
আইনবিদদের ব্যাখ্যা কী?
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি মুসলিম পারিবারিক আইনের সংশোধন নয়; এটি সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধন। তাঁর মতে, মুসলিম আইনে দানের যে বিধান রয়েছে, তা বহাল থাকবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীনের মতে, নিজের সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ বিশেষ করে বাবা-মা ও নারীদের জন্য ইতিবাচক। তাঁর মতে, সংশোধিত আইন মুসলিম পারিবারিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
তবে বিপরীত মতও স্পষ্ট। হেফাজতসহ ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো মনে করছে, আইনটি বাস্তবায়নের আগে শরিয়াহভিত্তিক হেবা ও মিরাসের বিধানের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
আইনের বাস্তব প্রয়োগই হবে বড় পরীক্ষা
আইন পাস হওয়া এক বিষয়, আর বাস্তবে একজন বৃদ্ধ বাবা বা মাকে সুরক্ষা দেওয়া আরেক বিষয়।
ধরা যাক, একজন মা সন্তানকে বাড়ি দান করলেন এবং দলিলে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করলেন। পরবর্তী সময়ে সন্তান তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইলে সেই অধিকার বাস্তবে কীভাবে দ্রুত প্রয়োগ করা হবে—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, শুধু দলিলে অধিকার লিখে দিলেই হবে না; সেই অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর হতে হবে।
একই সঙ্গে দলিল করার সময় দাতা প্রকৃতপক্ষে স্বেচ্ছায় দান করছেন কি না, তিনি মানসিকভাবে সক্ষম কি না, কোনো চাপ বা প্রতারণা ছিল কি না—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কারণ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। নতুন আইনের সুফল পেতে হলে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, আইনজীবী, স্থানীয় প্রশাসন ও আদালত—সব পর্যায়েই পরিষ্কার প্রয়োগপদ্ধতি প্রয়োজন হবে।
বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর বাস্তবতায় নতুন আইনের গুরুত্ব
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর হিসাবে দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ এই বয়সী মানুষ।
জনসংখ্যার এই বড় অংশের মধ্যে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে সন্তান বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগাধিকার তাঁদের শেষ বয়সের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমও আইনটিকে প্রবীণদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। তবে তিনি একই সঙ্গে আইনটির যথাযথ প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আরও পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সামনে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ
নতুন সংশোধিত আইন নিঃসন্দেহে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে একটি নতুন আইনি পথ তৈরি করেছে। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, মানুষকে জানতে হবে—সম্পত্তি দান করার সময় জীবনকালীন ভোগাধিকার কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দলিলে শর্তগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং নিবন্ধনের সময় দাতার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, দাতার অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
চতুর্থত, নতুন বিধানটি হেবা ও উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে কীভাবে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ হবে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের জন্য পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন।
সবশেষে, আইনটি বৃদ্ধ বাবা-মাকে সম্পত্তি দিয়ে সন্তানকে ‘পুরস্কৃত’ করার পরিবর্তে সম্পত্তি হস্তান্তর ও বার্ধক্যের নিরাপত্তাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করেছে—এটাই এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শেষ কথা
একজন বাবা-মা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে সন্তানকে বাড়ি বা জমি দিতে পারেন; কিন্তু সেই দানের বিনিময়ে শেষ বয়সে নিজের ঘর হারাবেন—এমন পরিস্থিতি যেন না হয়, নতুন আইনের মূল দর্শন সেদিকেই ইঙ্গিত করে। সংশোধিত আইনে দাতা সম্পত্তি অন্যের নামে দেওয়ার পরও জীবদ্দশার ভোগাধিকার ধরে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে একই সঙ্গে আইনটি নিয়ে ধর্মীয় ও আইনগত যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকারের ব্যাখ্যা, আইনবিদদের মতামত এবং ধর্মীয় পক্ষগুলোর আপত্তি—সব মিলিয়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে আইনের বাস্তব প্রয়োগ এবং বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা।
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সম্পত্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিধানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ও নির্ভুল আইনি ধারণা তৈরি করাও জরুরি।


0 মন্তব্যসমূহ