📢 প্রতিদিনের খেলার সূচি ও লেটেস্ট খেলার খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন ------ || ------ 📢 চাকরির নিয়োগ, পরীক্ষার সময়সূচি ও পরীক্ষার ফলাফল জানতে এখানে ক্লিক করুন ------ || ------ 📢 এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ: পাসের হার কমে ৬২.২৫%, জিপিএ–৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। ------ || ------ 📢 খেলা||-ক্রিকেট--অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়, ৯ উইকেটে হারিয়ে নতুন ইতিহাস। ------ || ------ 📢 ‘মুসলিম ন্যাটো’ নাকি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো? মক্কা চুক্তিতে বদলাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ।

স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়াই ২৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ভাড়া ভবনে উচ্চশিক্ষার নামে আপস

 

স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়াই ২৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ভাড়া ভবনে উচ্চশিক্ষার নামে আপস

স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়াই ২৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ভাড়া ভবনে উচ্চশিক্ষার নামে আপস

নিজস্ব প্রতিবেদক | পকেট নিউজ

প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে গত এক যুগে একের পর এক নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই এখনো স্থায়ী হয়নি। নিজস্ব জমি, একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসিক সুবিধা কিংবা শিক্ষার্থীবান্ধব পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস—এসবের অনেকটাই অনুপস্থিত। কোথাও ভাড়া করা বাড়ির কয়েকটি কক্ষে প্রশাসনিক কার্যক্রম, কোথাও একাধিক ভবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাঠদান, আবার কোথাও এখনো শিক্ষার্থী ভর্তি শুরুই হয়নি।

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনো নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। এর মধ্যে পাঁচটিতে শিক্ষা কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য নিয়োগসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলেও স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, নাকি আগে আইন পাস ও উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে পরে ধীরে ধীরে ক্যাম্পাস তৈরির চেষ্টা করা হবে?

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দ্বিতীয় পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে জনগণের অর্থে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ছে, অথচ শিক্ষা ও গবেষণার মৌলিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় আছে, ক্যাম্পাস নেই

স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা ২৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসা ও বিশেষায়িত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়।

ছয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলো—জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়—খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

এ ছাড়া নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশ (ইউএফটিবি), এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ও এ তালিকায় রয়েছে।

এই তালিকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি ভাড়া ভবনে চলছে, কিছু একাধিক অস্থায়ী ভবনে বিভক্ত, আবার কিছু স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জমি নির্ধারণ করলেও নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি।

ইউজিসির বর্তমান প্রকল্প ব্যবস্থাপনা তথ্যেও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস ও অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের অস্তিত্ব দেখা যায়। অর্থাৎ স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বিনিয়োগের অংশ হলেও প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

সুনামগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাঠদান

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রটি সমস্যাটিকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

২০২০ সালের নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন পাস হয়। প্রায় দেড় বছর পর ২০২২ সালের জুনে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।

প্রস্তাবিত স্থায়ী ক্যাম্পাসের জায়গা হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে আহসানমারা সেতুর পূর্ব পাশে দেখার হাওরের পাড়ের এলাকা। কিন্তু সেখানে এখনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দৃশ্য নেই।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে ভাড়া করা বাড়িতে। পাঠদানের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন। কোথাও মাদ্রাসার ভবনের কয়েকটি তলায় ক্লাস, কোথাও কলেজের ভবনে ল্যাবরেটরি, আবার অন্য ভবনে চলছে পৃথক বিভাগের পাঠদান।

শিক্ষার্থীদের থাকার জন্যও আলাদা ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর শুধু ক্লাস করার সুযোগ তৈরি হয়; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ—লাইব্রেরি, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, একাডেমিক কমিউনিটি এবং আবাসিক জীবন—তা তৈরি হয় না।

ফলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ‘ক্লাস নেওয়ার জায়গা’ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই চিত্র

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশও একই সমস্যার মুখে।

বিশেষায়িত প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন পাস হয় ২০১৬ সালে। ২০১৮ সালে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু আট বছর পরও নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

একাডেমিক কার্যক্রম চলছে একাধিক ভাড়া ভবনে। একটি ভবনে তিনটি বিভাগের পাঠদান, অন্য ভবনে প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং আরও দূরের একটি ভবনে অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

একটি প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কম্পিউটার, সফটওয়্যার, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবোটিকস কিংবা ইন্টারনেট অব থিংসের মতো বিষয়ে শুধু শ্রেণিকক্ষ থাকলেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন আধুনিক ল্যাবরেটরি, উচ্চগতির ইন্টারনেট, গবেষণা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সংযোগ।

নিজস্ব ক্যাম্পাসের অভাবে এসব সুবিধা সীমিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

‘আগে বিশ্ববিদ্যালয়, পরে ক্যাম্পাস’—সমস্যার মূল কোথায়?

তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল অর্থের ঘাটতি নয়; এর সঙ্গে জড়িত পরিকল্পনার ধরন।

একটি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাধারণত আইন পাস, উপাচার্য নিয়োগ এবং প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির পর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার চাপ তৈরি হয়। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে জমি নির্বাচন, ভূমি অধিগ্রহণ, মাস্টারপ্ল্যান, একাডেমিক ভবন, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, শিক্ষক আবাসন, শিক্ষার্থী হল, পরিবহন, নিরাপত্তা, গবেষণা অবকাঠামোসহ বহু বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা—দুটি এক বিষয় নয়।

কাগজে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হতে পারে একদিনে। কিন্তু একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।

ভাড়ার পেছনে যাচ্ছে সরকারি অর্থ

স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম চালাতে ভাড়া করা ভবনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই ভাড়া বাবদ মাসে প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার টাকা ব্যয়ের তথ্য এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের ভাড়া ব্যয় চলতে থাকলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভাড়া ভবনে ব্যয় করা অর্থ স্থায়ী সম্পদ তৈরি করে না। বিপরীতে স্থায়ী ক্যাম্পাসে বিনিয়োগ করলে ভবন, ল্যাব, লাইব্রেরি ও অন্যান্য অবকাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হিসেবে থেকে যায়।

অবশ্য অস্থায়ী সময়ে সীমিত পরিসরে ভাড়া ভবন ব্যবহার পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালুর সময় সাময়িক অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সেই ‘সাময়িক’ ব্যবস্থা বছরের পর বছর স্থায়ী হয়ে যায়।

পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি

স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকার তালিকায় থাকা পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। এগুলো হলো—মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষা কার্যক্রম শুরু না করার সুযোগটিকে কি প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?

যদি এসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর আগে জমি, মাস্টারপ্ল্যান, অবকাঠামো, শিক্ষক, গবেষণা সুবিধা ও আবাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব।

কিন্তু প্রস্তুতি ছাড়াই আবার ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হলে একই সংকট নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নীতিমালা আছে, বাস্তবায়ন কতটা?

নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর আগে ন্যূনতম অবকাঠামো নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ইউজিসি ২০২৩ সালে ‘নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর পূর্বের নীতিমালা’ অনুমোদন করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালাটির উদ্দেশ্য ছিল আইন পাসের পরপরই ভাড়া করা বাড়ি বা অস্থায়ী স্থাপনায় যেনতেনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার প্রবণতা বন্ধ করা।

কিন্তু নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল হলে তার কার্যকারিতা থাকে না।

এখানেই ইউজিসির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউজিসি নিজেই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, নীতিমালা প্রণয়ন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব পালন করে।

ফলে প্রশ্ন হচ্ছে—কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন পর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে, তার জন্য কি বাস্তবভিত্তিক ও বাধ্যতামূলক মানদণ্ড তৈরি করা হবে?

বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় কেন?

আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চরিত্র।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করা। কিন্তু কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মানবিক, সমাজবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা বা অন্যান্য সাধারণ বিষয় যুক্ত হচ্ছে।

বিষয় বৈচিত্র্য নিজে খারাপ নয়। কিন্তু যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্দেশ্যই হয় বিশেষায়িত দক্ষতা তৈরি, তাহলে অতিরিক্ত সাধারণ বিভাগ যুক্ত হওয়ার ফলে তার বিশেষায়িত চরিত্র দুর্বল হতে পারে।

বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভাগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাই শুধু শিক্ষার্থীর চাহিদা নয়, জাতীয় দক্ষতার চাহিদা, কর্মসংস্থান, গবেষণার সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

নিয়োগ আগে, অবকাঠামো পরে—উদ্বেগ এখানেও

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো না থাকলেও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগও এসেছে।

এখানে ঝুঁকি দুটি।

প্রথমত, শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ে।

দ্বিতীয়ত, বড় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালিত না হলে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগের সুযোগ তৈরি হয়।

অতীতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। তাই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া, পদ সৃষ্টি, বিভাগ অনুমোদন ও ব্যয়ের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নয়, মান নিয়ে ভাবার সময়

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো আর উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো এক বিষয় নয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত হতে হলে শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেই হয় না। প্রয়োজন গবেষণার পরিবেশ, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, দক্ষ শিক্ষক, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আবাসন, সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সংযোগ।

সরকারি পরিসংখ্যান ও ইউজিসির তথ্যভিত্তিক আলোচনায় দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে অবকাঠামো ও মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বহুদিন ধরেই সামনে এসেছে। একই সময়ে ইউজিসি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পও তদারক করছে।

সুতরাং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে’ নয়; বরং ‘কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কার্যকরভাবে মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছে’।

প্রয়োজন নতুন পরিকল্পনা

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

প্রথমত, আইন পাসের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও জাতীয় প্রয়োজন নির্ধারণ।

দ্বিতীয়ত, জমি ও স্থায়ী ক্যাম্পাসের মাস্টারপ্ল্যান নিশ্চিত না করে শিক্ষা কার্যক্রম না শুরু করা।

তৃতীয়ত, অস্থায়ী ক্যাম্পাস ব্যবহার করলে তার জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ।

চতুর্থত, স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা।

পঞ্চমত, নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত লক্ষ্য ও জাতীয় কর্মসংস্থানের চাহিদা বিবেচনা করা।

ষষ্ঠত, শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীর অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

শেষ কথা

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ভাড়া ভবনের কয়েকটি কক্ষ, একটি সাইনবোর্ড কিংবা একজন উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় না। বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান, গবেষণা ও মানবসম্পদ তৈরির প্রতিষ্ঠান।

তাই স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়াই ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলার বিষয়টি শুধু অবকাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, গবেষণার সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন থাকতেই পারে। কিন্তু প্রস্তুতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে প্রতিষ্ঠান বাড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়ে না।

এখন প্রয়োজন সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাস্তব অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা। কারণ জনগণের অর্থে প্রতিষ্ঠিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা শুধু একটি ক্লাসরুম নয়—তারা চায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়জীবন।

আরো পড়ুন
পোস্ট লোড হচ্ছে...

নিয়মিত সকল খবরের আপডেট পেতে পকেট নিউজ এর সাথে থাকুন। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর। www.pocketnews.online

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ