ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৫১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে
পকেট নিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তথ্যসূত্র: সিএনএন
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৪ হাজার ৫১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন গত শুক্রবার দেশটির আইনপ্রণেতাদের এই হিসাব জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
পেন্টাগনের হিসাবে, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে অতিরিক্ত জ্বালানি বাবদ আরও ১৫০ কোটি ডলার ব্যয় যুক্ত হয়েছে। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫১০ কোটি ডলার।
তবে এই অর্থকে যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ক্ষতির হিসাব হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কারণ, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনা মেরামতের ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন সামরিক ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। গত জুলাইয়ে পেন্টাগন জানিয়েছিল, তখন পর্যন্ত ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার।
এরপর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্যয় আরও কয়েকশ কোটি ডলার বেড়েছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল সামরিক ব্যয় ৪ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় যোগ করলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫১০ কোটি ডলার।
এই ব্যয়ের বড় অংশ গেছে যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার ও প্রতিস্থাপন, সামরিক সরঞ্জাম, বিমান পরিচালনা, জ্বালানি এবং অন্যান্য সামরিক কার্যক্রমে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ইরান সংঘাতের কারণে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বিভাগের যুদ্ধ-সংক্রান্ত ব্যয় ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের হিসাব
মার্কিন কংগ্রেসের নির্দলীয় বাজেট গবেষণা প্রতিষ্ঠান কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসও ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে পৃথক বিশ্লেষণ করেছে।
সংস্থাটির ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের পরিচালন, সরবরাহ ও যুদ্ধ-পরবর্তী সক্ষমতা বজায় রাখার ব্যয় মিলিয়ে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধে হারানো সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, বিমান পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয়, অন্যান্য সামরিক কার্যক্রম এবং বাড়তি জ্বালানি ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের হিসাব এবং পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব এক সময়সীমার নয়। পেন্টাগনের ৪৫১০ কোটি ডলারের হিসাব ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, আর কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের ৩৮ বিলিয়ন ডলারের হিসাব ১ আগস্ট পর্যন্ত। তাই দুটি অঙ্ককে সরাসরি তুলনা করলে সময়ের পার্থ্য বিবেচনায় নিতে হবে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস আরও জানিয়েছে, যুদ্ধের তীব্রতা কম থাকলে প্রতি মাসে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার এবং জুলাইয়ের মতো তীব্রতা থাকলে মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। সংঘাত আরও তীব্র হলে মাসিক ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটির মেরামত ব্যয় এখনো আলাদা
পেন্টাগনের ৪৫১০ কোটি ডলারের হিসাবেও যুদ্ধের সব আর্থিক ক্ষতি প্রতিফলিত হয়নি। সংঘাতের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামতের ব্যয় এই অঙ্কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক স্থাপনা পুনর্গঠন ও মেরামতে আরও অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। পাশাপাশি যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের মজুত পুনরায় পূরণ করতেও অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসও জানিয়েছে, তাদের ১ আগস্ট পর্যন্ত ৩৮ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের মধ্যে সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত সরকারের অন্যান্য অংশের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়। সামরিক বাহিনীর স্বাভাবিক পরিচালন ব্যয়ের যেসব অংশ আগে থেকেই বাজেটে রয়েছে, সেগুলোরও সবটুকু এই হিসাবে ধরা হয়নি।
যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি বাজারেও
ইরান যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি—যেমন পেট্রল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানির দামেও পড়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খাত নয়, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়। কারণ অধিকাংশ পণ্য পরিবহনের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস।
সংস্থাটির হিসাবে, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বাড়তে পারে। ব্যক্তিগত ভোগব্যয়ের মূল্যসূচকভিত্তিক মূল্যস্ফীতি আগের পূর্বাভাসের চেয়ে ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হতে পারে বলে তাদের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাদ দিয়ে মূল মূল্যস্ফীতিও ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ সংঘাতের প্রভাব সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি জ্বালানি, পরিবহন ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধের পরিধি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর ইরানও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়।
সংঘাতের সময় ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এর ফলে সংঘাতের প্রভাব ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এরই মধ্যে ওমান, কাতার, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ সংঘাত কমানো ও কূটনৈতিক সমাধানের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এখনো সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সামনে আরও বাড়তে পারে মার্কিন ব্যয়
ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় আরও বাড়বে—এমনটাই বলছে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের বিশ্লেষণ। সংঘাতের তীব্রতার ওপর ব্যয়ের গতি নির্ভর করবে।
এদিকে যুদ্ধের সরাসরি সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, ব্যবহৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামের মজুত পূরণ এবং সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য ভবিষ্যতে আরও অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে পেন্টাগনের ৪ হাজার ৫১০ কোটি ডলারের বর্তমান হিসাবকে যুদ্ধের চূড়ান্ত আর্থিক মূল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয়, সামরিক অভিযান কতটা তীব্র থাকে এবং এর ফলে জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কতটা প্রভাব পড়ে—এসব বিষয়ের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয়ের পরিমাণ আরও পরিবর্তিত হতে পারে।


0 মন্তব্যসমূহ