এক দিনের ব্যবধানে আবহাওয়ার বড় পরিবর্তন, ঢাকায় ৯ ঘণ্টায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি
পকেট নিউজ আবহাওয়া ডেস্ক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এক দিনের ব্যবধানেই দেশের আবহাওয়ার চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। শনিবার দেশের ১২ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার পর রোববার সকাল থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যান চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ৯ ঘণ্টায় ঢাকায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এর আগের দিন শনিবার রাজধানীতে তাপপ্রবাহ না থাকলেও গরমের তীব্রতা ছিল বেশি। দেশের ১২ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় দিনের আবহাওয়া ছিল গরম ও অস্বস্তিকর। সেই পরিস্থিতির পর রাত থেকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এক দিনের ব্যবধানেই আবহাওয়ার চিত্রে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এর প্রধান কারণ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা মৌসুমি বায়ুর হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠা।
রাত থেকে ঢাকায় বৃষ্টি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সকালে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়।
মৌচাক, মগবাজারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় রাস্তায় পানি জমে জনসাধারণকে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। কোথাও কোথাও পথচারীদের জমে থাকা পানি পার হয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
রাজধানীর সড়কে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক যান চলাচলেও প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল, সেখানে বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতা বেশি দৃশ্যমান হয়।
তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকায় রোববার আরও কিছু সময় থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে। পরে বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসতে পারে।
নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি
শুধু রাজধানী নয়, দেশের আরও কয়েকটি এলাকাতেও বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টার হিসাবে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। সেখানে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকাতেও বৃষ্টির প্রভাব দেখা গেছে। তবে দেশের সব অঞ্চলে একই মাত্রায় বৃষ্টি হয়নি। চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এরপর বৃষ্টির প্রভাব দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা। বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি এলাকায় বৃষ্টি
শনিবার সন্ধ্যায় দেওয়া আবহাওয়ার পূর্বাভাসে দেশের কিছু এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। তবে বাস্তবে বৃষ্টির বিস্তৃতি পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্বাভাসে প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় তা প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
আবহাওয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনের পেছনে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় হয়ে ওঠাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আবহাওয়াবিদেরা। কয়েক দিন তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় থাকার পর মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
কেন হঠাৎ এত বৃষ্টি?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু হঠাৎ সক্রিয় হয়ে যাওয়াই এই বৃষ্টির মূল কারণ।
শনিবার রাতে রাজধানীতে বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই বৃষ্টি রোববার সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এতটা পানি জমবে—এটি পূর্বাভাসে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস নির্ধারণে বিভিন্ন বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার মাত্রা ও এর বিস্তৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হলে বৃষ্টির পরিমাণ ও বিস্তৃতিও পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি হতে পারে। এবারের পরিস্থিতিতেও এমন পরিবর্তন দেখা গেছে।
সোমবার বৃষ্টি কমতে পারে
রোববার রাজধানীতে আরও কিছু সময় থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সোমবার ঢাকায় বৃষ্টি নাও থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
অর্থাৎ রোববারের বৃষ্টির পর রাজধানীর আবহাওয়া আবার কিছুটা শুষ্ক হয়ে উঠতে পারে। যদিও দেশের সব অঞ্চলে একই পরিস্থিতি থাকবে কি না, তা স্থানীয় আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে বৃষ্টির কারণে দিনের তাপমাত্রাও কিছুটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে বৃষ্টির পর আর্দ্রতা বেড়ে গেলে বৃষ্টি থামার পর আবারও ভ্যাপসা গরম অনুভূত হতে পারে।
সাগরে লঘুচাপ, সামনে নতুন আবহাওয়া পরিবর্তনের সম্ভাবনা
এদিকে বঙ্গোপসাগরে ইতিমধ্যে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই লঘুচাপকে ঘিরে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, লঘুচাপটির প্রভাবে ভারতের ওডিশা বা অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেটি ঘূর্ণিঝড়েও রূপ নিতে পারে বলে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে কোনো লঘুচাপ থেকে শেষ পর্যন্ত গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হবে কি না, তা নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে এর গতিপথ, শক্তি এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির ওপর। তাই এ বিষয়ে পরবর্তী আবহাওয়া পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তার দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশেও পড়তে পারে প্রভাব
সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ভারতের উপকূলীয় এলাকায় আবহাওয়ার পরিবর্তনের পাশাপাশি বাংলাদেশেও বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এর অর্থ, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে লঘুচাপের অবস্থান ও গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং অন্যান্য এলাকায় বৃষ্টির মাত্রায়ও পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে এখনই সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়া অধিদপ্তর পরবর্তী সময়ে আরও নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দিতে পারে।
গরম থেকে বৃষ্টিতে দ্রুত পরিবর্তন
শনিবার দেশের ১২ জেলায় তাপপ্রবাহ এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গরমের পর মাত্র এক রাতের ব্যবধানে ব্যাপক বৃষ্টিপাত—সাম্প্রতিক আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
ঢাকায় মাত্র ৯ ঘণ্টায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি এবং নারায়ণগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের তথ্য থেকে বোঝা যায়, অল্প সময়ের মধ্যে দেশের কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের কারণে একদিকে যেমন তাপমাত্রা থেকে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টিতে রাজধানীর জলাবদ্ধতা, যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কাও থাকে। পাশাপাশি সাগরে নতুন করে লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় আগামী কয়েক দিনে দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
এ অবস্থায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষকে নিয়মিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের সাগরের পরিস্থিতি সম্পর্কে পরবর্তী সরকারি নির্দেশনার দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।


0 মন্তব্যসমূহ