মেয়ের বাড়ি যাওয়া হলো না ফিরোজার, প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল মহাসড়কে
নিজস্ব প্রতিবেদক,পকেট নিউজ | ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ নিয়ে শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন ফিরোজা বেগম। গন্তব্য ছিল বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গুজিয়া গ্রামে বড় মেয়ে শিরি বেগমের বাড়ি। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হলো না। অটোরিকশা ধরতে মোকামতলা–জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়ক পার হওয়ার সময় একটি সরকারি গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক ইউনিয়নের গোপীনাথপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। গাড়িটি জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারীকে বহন করছিল। দুর্ঘটনার পর গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের ধানখেতে নেমে যায়। এতে প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রীও আহত হন। ঘটনাটি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই বদলে গেল একটি পরিবারের গল্প
সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ফিরোজা বেগমের উদ্দেশ্য ছিল একেবারেই স্বাভাবিক—মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড় মেয়ে শিরি বেগমের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গুজিয়া গ্রামে। সেখানে যাওয়ার জন্য অটোরিকশা ধরতেই তাঁকে মহাসড়ক পার হতে হচ্ছিল।
কিন্তু মহাসড়ক পার হওয়ার সময়ই ঘটে দুর্ঘটনা। সরকারি গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হন ফিরোজা। স্থানীয়ভাবে তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—মহাসড়কে ওই মুহূর্তে কী ঘটেছিল, গাড়ির গতি কত ছিল, চালকের সামনে পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং পথচারীকে এড়াতে গিয়ে গাড়িটি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধানখেতে গিয়ে পড়ল। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আইনগত প্রক্রিয়া ও তদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফিরোজার জীবনের শেষ যাত্রা
ফিরোজা বেগম ছিলেন শিবগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী নিজামুদ্দীন সরকার মারা গেছেন। দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মা ছিলেন তিনি।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে বড় ছেলে ফেরদৌস হোসেনও মারা যান। ছোট ছেলে সেলিম সরকার কৃষিকাজ করেন। পাঁচ মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর মৃত্যুর পর বড় ছেলে ফেরদৌসের স্ত্রী রিপা বেগম এবং ছোট ছেলে সেলিমের স্ত্রী রেশমা বেগমের সঙ্গে থাকতেন ফিরোজা।
পরিবারের স্বজনেরা জানান, অল্প জমিজমা চাষাবাদ করে কোনোভাবে সংসার চলত। জীবনের শেষ সময়েও তাঁর গন্তব্য ছিল নিজের মেয়ের বাড়ি—একটি সাধারণ পারিবারিক সফর। সেই পথেই ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
‘মেয়ের বাড়ি যাওয়া হলো না, ফিরলেন লাশ হয়ে’
ফিরোজার পুত্রবধূ রেশমা বেগমের কথায় ফুটে উঠেছে পরিবারের শোকের গভীরতা। সকালে শাশুড়ি মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই মানুষটির মৃত্যুর খবর পেতে হবে—এটি যেন পরিবারের কারও কল্পনাতেও ছিল না।
রেশমার ভাষায়, ‘মেয়ের বাড়িত বেড়াবার যাওয়া হলো না, ফিরলেন লাশ হয়্যা।’
এই একটি বাক্যেই যেন দুর্ঘটনার পর একটি পরিবারের হঠাৎ শূন্য হয়ে যাওয়ার চিত্র ফুটে ওঠে।
সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন বড় ছেলে ফেরদৌসের স্ত্রী রিপা বেগম। স্বামীকে হারানোর পর শাশুড়িই তাঁর জীবনে বড় আশ্রয় হয়ে ছিলেন। স্বজনদের কাছে তিনি জানিয়েছেন, ফিরোজা তাঁর কাছে ছিলেন বটবৃক্ষের ছায়ার মতো।
একজন প্রবীণ পরিবারের সদস্যের মৃত্যু শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়; অনেক সময় এর সঙ্গে একটি পরিবারের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার একটি স্তরও হারিয়ে যায়। ফিরোজার ক্ষেত্রেও তাঁর স্বজনদের বক্তব্যে সেই শূন্যতার চিত্র স্পষ্ট।
স্বজনদের দাবি, অভিযোগ নেই
দুর্ঘটনার পর ফিরোজার স্বজনেরা ঘটনাটিকে আপাতত দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের একজন জাকির হাসান জানান, মহাসড়ক পার হওয়ার সময় অসাবধানতাবশত গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে। তিনি বলেন, ফিরোজা বয়সে প্রবীণ ছিলেন এবং ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বলেই তাঁরা মনে করছেন।
স্বজনদের এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত দায় বা কারণ নির্ধারণের বিষয়টি আলাদা। কোনো দুর্ঘটনায় কারও অভিযোগ আছে কি না, তার পাশাপাশি কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সড়কের পরিস্থিতি কী ছিল, গাড়ির চালনা ও নিয়ন্ত্রণের অবস্থা কেমন ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর গাড়ি ধানখেতে
দুর্ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ফিরোজার সঙ্গে ধাক্কার পর সরকারি গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের ধানখেতে নেমে যায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী ও তাঁর স্ত্রী নাজমা আরা বারীও আহত হন।
অর্থাৎ একই ঘটনায় একদিকে একজন পথচারীর প্রাণহানি ঘটেছে, অন্যদিকে সরকারি গাড়িতে থাকা প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার এই বহুমাত্রিক প্রেক্ষাপট ঘটনাটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি তৈরি করে।
মহাসড়ক পারাপারে নিরাপত্তার প্রশ্ন
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও মহাসড়কগুলোতে পথচারীদের নিরাপদ পারাপার দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বাজার, ইউনিয়ন সড়কের সংযোগস্থল কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মহাসড়ক পার হওয়ার সময় পথচারীদের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রবীণ মানুষদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বয়সজনিত কারণে চলাচলের গতি কমে যাওয়া, দ্রুতগতির যানবাহনের দূরত্ব ও গতি বুঝতে সমস্যা হওয়া কিংবা রাস্তা পার হওয়ার সময় সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগা—সবকিছু মিলিয়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
গোপীনাথপুরের এই ঘটনাও তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি মহাসড়কে পথচারী নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
তদন্তই দেবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ
শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
এখন তদন্তে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান, গাড়ির গতিবেগ, চালকের প্রতিক্রিয়া, সড়কের অবস্থা, পথচারী পারাপারের পরিস্থিতি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর আহত ফিরোজাকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেটিও পরবর্তী প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হবে।
শেষ হলো একটি সাধারণ যাত্রা, শুরু হলো পরিবারের শোক
ফিরোজা বেগমের শুক্রবারের যাত্রা ছিল খুব সাধারণ। মেয়ের বাড়িতে কয়েক দিন কাটাবেন, স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাবেন—এমনই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে সেই পরিকল্পনাকে বদলে দিয়েছে।
যে মানুষটি সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে, কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর মরদেহ নিয়ে স্বজনদের বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—সড়কে একটি মুহূর্তের অসতর্কতা কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানো কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে পথচারী ও যানবাহন—উভয়ের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজন রয়েছে।
ফিরোজার পরিবার হয়তো এই মৃত্যু নিয়ে আপাতত কোনো অভিযোগ তুলছে না। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া একটি প্রশ্ন রেখে গেছে—মহাসড়কে এমন দুর্ঘটনা আর কত পরিবারকে তাদের প্রিয়জন হারানোর শোক বহন করতে হবে?


0 মন্তব্যসমূহ