মরক্কোর প্রথম নারী সরকারপ্রধান ফাতিমা জাহরা আল মানসুরি
পিএএমকে সরকার গঠনের দায়িত্ব, সামনে জোট গঠন ও ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির বড় চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মরক্কোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ ২৯ সেপ্টেম্বর ফাতিমা জাহরা আল মানসুরিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান হলেন। এর আগে তিউনিসিয়ায় নাজলা বুদেন ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। (Reuters)
ফাতিমা জাহরা আল মানসুরি দেশটির অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (পিএএম)-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা। ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে পিএএম ৩৯৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ৯৭টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বেশি আসন অর্জন করে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৯৮টি আসন দলটি পায়নি। ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে এখন জোট গঠন করে সরকার পরিচালনার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে। (Maroc)
ঐতিহাসিক দায়িত্ব পেলেন ফাতিমা
রাজপ্রাসাদের ঘোষণার পর ফাতিমা মানসুরি তাঁর নিয়োগকে মরক্কোর ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, একজন নারী হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া তাঁর নিজের পাশাপাশি দেশের নারীদের জন্যও গর্বের বিষয়। (Anadolu Agency)
৫০ বছর বয়সী ফাতিমা মানসুরি আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয় পিএএমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর। তিনি ২০০৯ সালে মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন এবং শহরটির প্রথম নারী মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় পরিকল্পনা, নগর পরিকল্পনা, আবাসন ও নগরনীতি-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। (Anadolu Agency)
নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পিএএমের
২৩ সেপ্টেম্বর মরক্কোয় প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, পিএএম ৯৭টি আসন নিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। এরপর ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস বা আরএনআই ৬৬, ইস্তিকলাল পার্টি ৬৫ এবং জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা পিজেডি ৫৪টি আসন পেয়েছে। (Maroc)
নির্বাচনের প্রধান ফল
| দল | আসন |
|---|---|
| অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (পিএএম) | ৯৭ |
| ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস (আরএনআই) | ৬৬ |
| ইস্তিকলাল পার্টি | ৬৫ |
| জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) | ৫৪ |
| পপুলার মুভমেন্ট | ২৯ |
| সোশ্যালিস্ট ইউনিয়ন অব পপুলার ফোর্সেস | ২৬ |
| অন্যান্য দল | ৫৮ |
| মোট | ৩৯৫ |
মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৫ সেপ্টেম্বর ঘোষিত চূড়ান্ত ফলাফল ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। (Maroc)
এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ নেই
৩৯৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ১৯৮টি আসন। পিএএম পেয়েছে ৯৭টি। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দলটি ১০১ আসন দূরে রয়েছে।
তাই ফাতিমা মানসুরির প্রথম রাজনৈতিক দায়িত্বগুলোর একটি হবে অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি কার্যকর সংসদীয় জোট গঠন করা। রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাঁকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া এখন তাঁর নেতৃত্বেই এগোবে। (Anadolu Agency)
পিএএমের সঙ্গে বিভিন্ন দলের সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা আরএনআই এবং ইস্তিকলাল—দুই দলই সংসদে উল্লেখযোগ্য আসন পেয়েছে। অন্যদিকে পিজেডি ৫৪টি আসন পেলেও বিরোধী অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে। (Al Jazeera)
পিএএমের রাজনৈতিক পটভূমি
অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফুয়াদ আলী আল হিম্মার নাম রয়েছে। পিএএম পরবর্তী সময়ে মরক্কোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (Al Jazeera)
২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটির সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ দলটির নেতৃত্ব থেকে একজনকে সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। সেই দায়িত্ব পেয়েছেন ফাতিমা জাহরা আল মানসুরি।
সামনে বড় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব
নতুন সরকারের সামনে শুধু জোট গঠনই নয়, অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিশেষ করে ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মরক্কোয় বড় আকারের অবকাঠামো ও উন্নয়ন বিনিয়োগ চলছে।
মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগাল যৌথভাবে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। বিশ্বকাপকে ঘিরে অবকাঠামো, পরিবহন, পর্যটন, ক্রীড়া স্থাপনা ও অন্যান্য খাতে বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন সরকারকে এসব বিনিয়োগের অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। (Reuters)
তরুণদের প্রত্যাশাও বড় বিষয়
নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিচ্ছে, যখন মরক্কোর অর্থনীতি ও জনসেবার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তরুণদের মধ্যে অসন্তোষের কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল তুলনামূলকভাবে কম—সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩৮.০২ শতাংশ। (Maroc)
ফলে নতুন সরকারের জন্য কর্মসংস্থান, জনসেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে কোন খাতে কী ধরনের নীতি নেওয়া হবে, তা সরকার গঠনের পর নতুন কর্মসূচিতে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
আরব বিশ্বে দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান
ফাতিমা মানসুরির নিয়োগ শুধু মরক্কোর জন্য নয়, আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ২০২১ সালে তিউনিসিয়ার নাজলা বুদেন প্রথম আরব নারী হিসেবে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ফাতিমা মানসুরির নিয়োগের মাধ্যমে আরব বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী পেল দেশটি। (Al Jazeera)
তবে তাঁর সামনে থাকা রাজনৈতিক বাস্তবতা বেশ জটিল। পিএএম সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তাই নতুন সরকার কত দ্রুত গঠিত হবে এবং কোন দলগুলো জোটে যুক্ত হবে—এখন মরক্কোর রাজনীতিতে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক নজরে
নতুন প্রধানমন্ত্রী: ফাতিমা জাহরা আল মানসুরি
নিয়োগের তারিখ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশ: মরক্কো
ঐতিহাসিক অবস্থান: দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান
দল: অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি
পিএএমের আসন: ৯৭
প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন: ৩৯৫
সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন: ১৯৮
নির্বাচনের তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আরব বিশ্বের নারী সরকারপ্রধান হিসেবে অবস্থান: দ্বিতীয়
সামনের বড় দায়িত্ব: সরকার গঠন, জোট আলোচনা ও ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি
মরক্কোর রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়
ফাতিমা জাহরা আল মানসুরির নিয়োগ মরক্কোর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে এই ঐতিহাসিক নিয়োগের পর তাঁর সামনে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক কাজ হলো সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করে নতুন সরকার গঠন করা।
পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনসেবা, তরুণদের প্রত্যাশা এবং ২০৩০ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে অবকাঠামোগত প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো নতুন সরকারের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। ফলে মরক্কোর রাজনীতিতে নারী সরকারপ্রধানের এই নতুন অধ্যায় শুধু প্রতীকী পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর সঙ্গে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনও আসবে—তা আগামী দিনের সরকারের কর্মসূচিতে স্পষ্ট হবে।
তথ্যসূত্র
পকেট নিউজ | হাতের মুঠোয় সকল খবর


0 মন্তব্যসমূহ