গিলের রেকর্ডগড়া ২২৩, পাঁচ সেঞ্চুরির ঐতিহাসিক ম্যাচে ভারতের জয়
ওয়ানডেতে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরি, রান তাড়ায় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস—এক ম্যাচেই একাধিক বিশ্ব রেকর্ড
গুয়াহাটি: ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আগে ব্যাট করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ৪০৫ রান সংগ্রহ করে। জবাবে ভারত মাত্র ৪৩ দশমিক ৩ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ৪০৬ রান তুলে ৮ উইকেটের বিশাল জয় পেয়েছে।
তবে এই ম্যাচের সব আলো কেড়ে নিয়েছেন ভারতের অধিনায়ক শুবমান গিল। ১৩৩ বলে ২৬টি চার ও ৮টি ছক্কার সাহায্যে ২২৩ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জয় এনে দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক বিশ্ব রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
১১৭ বলে ডাবল সেঞ্চুরি, গিলের নতুন বিশ্ব রেকর্ড
ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ৪০৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন গিল। মাত্র ৬২ বলে শতরান পূর্ণ করার পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ভারতীয় অধিনায়ক।
শেষ পর্যন্ত মাত্র ১১৭ বলে ২০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন গিল।
এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন ভারতেরই ঈশান কিষাণ। ২০২২ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ১২৬ বলে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। গিল সেই রেকর্ড ৯ বল কম খেলেই ভেঙে দিয়েছেন।
রান তাড়ায় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস
শুধু দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরিই নয়, ২২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস দিয়ে আরও একটি বড় রেকর্ড গড়েছেন গিল।
ওয়ানডেতে রান তাড়া করতে নেমে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড এখন তাঁর দখলে। এর আগে এই রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের।
২০২৩ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২০১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। গিল সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে ২২৩ রানে অপরাজিত থাকেন।
অর্থাৎ, চাপের মুখে ৪০৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করার সময় গিল শুধু দলকে জয়ই এনে দেননি, রান তাড়ার ইতিহাসেও নিজের নাম শীর্ষে লিখিয়েছেন।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও নতুন উচ্চতা
গিলের ২২৩ রানের ইনিংসের আরেকটি বিশেষত্ব রয়েছে। এটি শুধু আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে রান তাড়ার সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস নয়; লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও সর্বোচ্চ রান তাড়া করে করা ব্যক্তিগত ইনিংসের নতুন রেকর্ড।
এর আগে এই রেকর্ড ছিল বাংলাদেশের সৌম্য সরকারের দখলে। ২০১৯ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ২০৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন বাংলাদেশের বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
গুয়াহাটিতে সেই রেকর্ডও পেছনে ফেলেছেন গিল।
ওয়ানডেতে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করা দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান
গিলের এই ডাবল সেঞ্চুরি তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয়। এর ফলে ওয়ানডেতে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু ভারতের রোহিত শর্মার। রোহিত ওয়ানডেতে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন।
গিলের সামনে এখন রোহিতের তিন ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড। তবে গুয়াহাটির এই ইনিংস নিঃসন্দেহে তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
রোহিত-গিলের ২৫৫ রানের উদ্বোধনী জুটি
৪০৬ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। অধিনায়ক গিলের সঙ্গে ইনিংসের শুরু করেন রোহিত শর্মা।
দুজনের উদ্বোধনী জুটি ছিল বিধ্বংসী। মাত্র ২৬ দশমিক ২ ওভারে তাঁরা যোগ করেন ২৫৫ রান।
রোহিত শর্মা ৭৫ বলে ১০১ রান করে আউট হন। তাঁর ইনিংস সাজানো ছিল ১১টি চার ও ২টি ছক্কায়।
রোহিত ফিরে গেলেও ভারতের রান তাড়ায় কোনো ধাক্কা লাগেনি। বরং এরপর আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠেন গিল। শেষ পর্যন্ত একাই ভারতকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেন তিনি।
এক ইনিংসে পাঁচ সেঞ্চুরি—ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথম
গুয়াহাটির এই ম্যাচটি শুধু গিলের রেকর্ডের জন্যই নয়, দলগত ও সামগ্রিক ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসেও বিশেষ হয়ে থাকবে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে তিনজন ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছেন। জন ক্যাম্পবেল ৬৮ বলে ১০১, শাই হোপ ৯৪ বলে ১০৪ এবং আমির জঙ্গু ৭৭ বলে ১১৪ রান করেন।
জবাবে ভারতের হয়ে গিল ও রোহিতও শতরান করেন।
অর্থাৎ, একই ওয়ানডেতে দুই দলের মোট পাঁচজন ব্যাটসম্যান শতরান করেছেন। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম।
এক ম্যাচে পাঁচ সেঞ্চুরির এই নজির গুয়াহাটির ম্যাচটিকে ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে দিয়েছে।
এক নজরে পাঁচ সেঞ্চুরি
| ব্যাটসম্যান | দল | রান | বল |
|---|---|---|---|
| জন ক্যাম্পবেল | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ১০১ | ৬৮ |
| শাই হোপ | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ১০৪ | ৯৪ |
| আমির জঙ্গু | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ১১৪ | ৭৭ |
| রোহিত শর্মা | ভারত | ১০১ | ৭৫ |
| শুবমান গিল | ভারত | ২২৩* | ১৩৩ |
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ
টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরু থেকেই দুর্দান্ত ব্যাটিং করে।
ক্যাম্পবেল, হোপ ও জঙ্গুর তিন শতরানে ভর করে তারা ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ৪০৫ রান সংগ্রহ করে। এটি ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।
৪০০ পেরিয়ে যাওয়ার পর ভারতের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪০৬ রান। এত বড় লক্ষ্য তাড়া করা যে কোনো দলের জন্যই কঠিন হওয়ার কথা। কিন্তু গিল ও রোহিতের ব্যাটিং সেই কঠিন কাজকে সহজ করে দেয়।
৪০০-এর বেশি রান তাড়া করে ভারতের ঐতিহাসিক জয়
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রান টপকে ভারত ৪০৬ রান করে ম্যাচ জিতেছে ৩৯ বল হাতে রেখেই।
ওয়ানডেতে ৪০০ বা তার বেশি রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা এটি মাত্র দ্বিতীয়।
এর আগে ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৩৪ রান তাড়া করে জয় পেয়েছিল। সেটিই ছিল আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে প্রথম ৪০০-এর বেশি রান তাড়া করে জয়ের ঘটনা।
দুই দশক পর এই তালিকায় দ্বিতীয় দল হিসেবে ভারতের নাম যুক্ত হলো।
গিলের ইনিংসের পরিসংখ্যান
শুবমান গিলের ২২৩ রানের অপরাজিত ইনিংসটি ছিল আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের অসাধারণ উদাহরণ। ১৩৩ বলের ইনিংসে তিনি মেরেছেন ২৬টি চার ও ৮টি ছক্কা।
অর্থাৎ বাউন্ডারি থেকেই এসেছে তাঁর ১৫২ রান। বাকি রান এসেছে দৌড়ে নেওয়া রানের মাধ্যমে।
তিনি ৬২ বলে শতরান এবং ১১৭ বলে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। ফলে ইনিংসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল দ্রুত রান তোলার ধারাবাহিকতা।
এক ম্যাচে এতগুলো রেকর্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ
গুয়াহাটির এই ম্যাচের বিশেষত্ব শুধু ভারতের জয় নয়। একই ম্যাচে ব্যক্তিগত, দলীয় এবং সামগ্রিক ওয়ানডে ক্রিকেটের একাধিক রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, গিল দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন। দ্বিতীয়ত, রান তাড়ায় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস খেলেছেন। তৃতীয়ত, ওয়ানডেতে দ্বিতীয়বার ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। চতুর্থত, তাঁর ইনিংস লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও রান তাড়ায় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজও ৪০৫ রান করে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ পেয়েছে। ম্যাচটিতে পাঁচজন ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে নতুন নজির তৈরি করেছে।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত ফল
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ওয়েস্ট ইন্ডিজ | ৫০ ওভারে ৪০৫/৭ |
| ভারত | ৪৩.৩ ওভারে ৪০৬/২ |
| ফলাফল | ভারত ৮ উইকেটে জয়ী |
| ভারতের জয়ের ব্যবধান | ৩৯ বল হাতে রেখে |
| গিল | ২২৩* রান, ১৩৩ বল |
| রোহিত | ১০১ রান, ৭৫ বল |
| উদ্বোধনী জুটি | ২৫৫ রান |
| ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেঞ্চুরি | ৩টি |
| ভারতের সেঞ্চুরি | ২টি |
| ম্যাচে মোট সেঞ্চুরি | ৫টি |
গিলের ব্যাটে নতুন অধ্যায়
গুয়াহাটিতে শুবমান গিলের ২২৩ রানের ইনিংস শুধু একটি ম্যাচ জেতানো ইনিংস নয়; এটি ওয়ানডে ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ের একাধিক অধ্যায় একসঙ্গে বদলে দিয়েছে।
৪০৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে একজন অধিনায়কের কাছ থেকে এমন দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক ইনিংস ভারতের রান তাড়াকে একতরফা করে দেয়। রোহিত শর্মার শতরান এবং গিলের দ্বিশতরানে ভারতীয় ইনিংস আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে তিন সেঞ্চুরিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজও ব্যাটিংয়ের দিক থেকে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের ৪০৫ রানও যথেষ্ট হয়নি।
সব মিলিয়ে গুয়াহাটির এই ম্যাচটি ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ম্যাচ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে—যেখানে একদিকে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ, অন্যদিকে ভারতের রেকর্ডগড়া রান তাড়া; আর এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শুবমান গিল, যাঁর ২২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস একসঙ্গে একাধিক বিশ্ব রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র:
এএফপি এবং প্রদত্ত ম্যাচ-পরিসংখ্যান।
পকেট নিউজ | হাতের মুঠোয় সকল খবর


0 মন্তব্যসমূহ