Header Ads Widget

Responsive Advertisement

তামাক থেকে রাজস্ব ৪১ হাজার কোটি, ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি

তামাক থেকে রাজস্ব ৪১ হাজার কোটি, ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি: সস্তা সিগারেটের বড় ফাঁদে বাংলাদেশ


তামাক থেকে রাজস্ব ৪১ হাজার কোটি, ক্ষতি ৮৭ হাজার কোটি: সস্তা সিগারেটের বড় ফাঁদে বাংলাদেশ

অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য ডেস্ক, পকেট নিউজ | ১৬ মে, ২০২৬ 

দেশে তামাক খাত থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা হলেও, এর বিপরীতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, তামাক থেকে আয়ের চেয়ে দেশের মানুষের ও অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি। জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, জটিল কর কাঠামো এবং নিত্যপণ্যের তুলনায় দাম কম থাকার কারণে তামাক কোম্পানিগুলো দিন দিন লাভবান হচ্ছে, আর জনস্বাস্থ্য চলে যাচ্ছে এক গভীর সংকটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ ২০label৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে—প্রায় ৩৫.৩ শতাংশ। যেখানে ভারতে এই হার ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করছেন।

মৃত্যুর মিছিল ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতি

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘টোব্যাকো অ্যাটলাস’-এর তথ্য অনুসারে, তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়, যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১৮ শতাংশ। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভাল্যুশনের তথ্য বলছে, এই মৃত্যুর প্রায় ৭৯ শতাংশই ঘটে প্রত্যক্ষ ধূমপানের কারণে।

অর্থনীতির হিসাবটি আরও উদ্বেগজনক। ‘ইকোনমিক কস্টস অব টোব্যাকো ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে তামাক খাত থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসলেও চিকিৎসা ও পরিবেশের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে খরচ হয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকা।

নিত্যপণ্যের চেয়ে সস্তা সিগারেট!

গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সিগারেটের দাম সেই হারে বাড়েনি। ফলে বাস্তবে সিগারেট আরও সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে পড়েছে।

২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মূল্যবৃদ্ধি তুলনা:

  • খোলা চিনি: ৮৯% বৃদ্ধি

  • আলু: ৮৭% বৃদ্ধি

  • আটা: ৭৫% বৃদ্ধি

  • ডিম: ৪৩% বৃদ্ধি

  • সিগারেট (বিভিন্ন স্তর): মাত্র ৬% থেকে ১৫% বৃদ্ধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শাফিউন এন শিমুল জানান, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশে পরিবারপ্রতি আয় ১০৩ শতাংশ বাড়লেও নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ ও তরুণদের জন্য ধূমপান করা আরও সহজ হয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বের ১৬২টি দেশের মধ্যে কম দামি সিগারেটের সহজলভ্যতার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম।

নিম্নস্তরের সিগারেটের দখলে বাজার ও জটিল কর কাঠামো

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজারে নিম্নস্তরের সিগারেটের অংশীদারত্ব ছিল ২৫ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ, দেশের ধূমপায়ীদের বড় অংশই এখন সস্তা বা নিম্নস্তরের সিগারেট বেছে নিচ্ছেন।

এনবিআর-এর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি এক প্রাক-বাজট আলোচনায় স্বীকার করেছেন, "এত কম দামে আমাদের আশপাশের কোনো দেশে সিগারেট পাওয়া যায় না।" গবেষকদের মতে, দেশে তামাকের ৪টি মূল্যস্তর (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) থাকার কারণে ট্যাক্স বাড়ালেও ভোক্তারা পুরোপুরি ধূমপান না ছেড়ে কেবল স্তর পরিবর্তন করেন। এই জটিল কর কাঠামো মূলত তামাক কোম্পানিগুলোকেই সুবিধা দিচ্ছে।

তামাক কোম্পানির ‘ট্যাক্স’ দাবির আসল সত্য

তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়ই দাবি করে তারা দেশের সর্বোচ্চ করদাতা। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ২০২৪ সালে ৩৪,১৭৩ কোটি টাকা কর দিয়েছে। তবে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই করের ৯৫ শতাংশই পরোক্ষ কর, যা মূলত সাধারণ ভোক্তারা সিগারেট কেনার সময় পকেট থেকে দেন। কোম্পানিগুলোর নিজস্ব প্রত্যক্ষ কর বা আয়করের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫.২৭ শতাংশ।

কোম্পানিগুলোর আরেকটি বড় যুক্তি হলো—কর বাড়ালে চোরাচালান বা অবৈধ বাণিজ্য বাড়বে। তবে বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের গবেষণা এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে। তথ্যমতে, বাংলাদেশে সিগারেটের অবৈধ বাণিজ্য মাত্র ১.৮ শতাংশ, যেখানে ভারতে ১৭% এবং পাকিস্তানে তা ৩৮%।

আগামী ২০২৬-২৭ বাজেটে গবেষকদের যত প্রস্তাব

আসন্ন বাজেটে তামাকবিরোধী সংগঠন ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা বড় ধরনের কর সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন:

  • স্তর সমন্বয়: নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের সর্বনিম্ন দাম ১০০ টাকা করা।

  • অন্যান্য স্তর: উচ্চস্তরের প্যাকেট ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তর ২০০ টাকা করা।

  • নির্দিষ্ট কর: প্রতি প্যাকেটে নির্দিষ্ট ৪ টাকা হারে কর আরোপ করা।

  • সম্পূরক শুল্ক: সব স্তরেই ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা।

গবেষকদের দাবি, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়বেন, ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপানে জড়ানো থেকে বিরত থাকবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।

"তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধূমপায়ী করে তোলার নানা আয়োজন আছে। কিন্তু সরকার তো ব্যবসা করার জন্য নয়, মানুষের সেবা করার জন্য। রাজস্বের অজুহাত দেখিয়ে মানুষের এমন স্বাস্থ্যগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।" — অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল।

 সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, তামাকের ওপর কর আরোপের বিষয়টির সঙ্গে নৈতিকতা, সামাজিক সুরক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ জড়িত। তাই রাজস্ব আদায়ের চেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়টিই সরকারের প্রাধান্যের তালিকায় শীর্ষে থাকা উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ