রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক চিত্র: সোনালীর বড় মুনাফা, জনতার রেকর্ড লোকসান
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১০ মে, ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একসময় মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। একদিকে সোনালী ব্যাংক বড় মুনাফার রেকর্ড গড়ছে, অন্যদিকে জনতা ব্যাংক নিমজ্জিত হচ্ছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানে। সম্প্রতি প্রকাশিত ব্যাংক চারটির ২০২৫ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
সোনালী ব্যাংক: স্থিতিশীলতা ও বড় মুনাফা
বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ৯৮৮ কোটি টাকা থাকলেও ২০২৫ সাল শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায়।
অবস্থান: দেশে মুনাফার দিক থেকে ব্র্যাক ও সিটি ব্যাংকের পরই সোনালী ব্যাংকের অবস্থান।
সাফল্যের কারণ: বড় ঋণে ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকটি সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অলস টাকা বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি এসএমই ও ভোক্তা ঋণে জোর দেওয়ায় তাদের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমেছে। ব্যাংকটির বর্তমানে কোনো মূলধন ঘাটতি নেই।
জনতা ব্যাংক: খেলাপির ভারে বিধ্বস্ত
সোনালী যখন উড়ছে, জনতা ব্যাংক তখন ধুঁকছে। ব্যাংকটির ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় যাচ্ছে এখন। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকটির রেকর্ড লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা।
মূল সংকট: ব্যাংকটির মোট ঋণের ৭০ শতাংশই এখন খেলাপি। বেক্সিমকো, এস আলম, এননটেক্স ও ক্রিসেন্টের মতো বড় শিল্প গ্রুপের ঋণ আদায় না হওয়ায় এই বিপর্যয়।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি: আমানতকারীদের সুদ দিতে ব্যাংকটির যে খরচ হচ্ছে, ঋণ থেকে আয় হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। ফলে প্রতি বছর লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।
অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক: ‘বিশেষ সুবিধায়’ মুনাফা
অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের আর্থিক চিত্রকে বিশ্লেষকরা অনেকটা ‘কৃত্রিম’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এই দুটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড় নিয়ে কাগজে-কলমে মুনাফা দেখিয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক: ২০২৪ সালে ৯২৫ কোটি টাকা লোকসান দিলেও ২০২৫ সালে ৫৮ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। অথচ ব্যাংকটির ১৫ হাজার কোটি টাকার নিরাপত্তাসঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধায় এই ঘাটতি পূরণ না করেই মুনাফা দেখানো হয়েছে।
রূপালী ব্যাংক: ২০২৪ সালে ১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা মুনাফা করলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকায় নেমেছে। এই ব্যাংকটিও চাহিদামতো সঞ্চিতি রাখতে না পেরে বিশেষ সুবিধায় মুনাফা টিকিয়ে রেখেছে।
নীতিগত উদ্বেগ
নিরাপত্তাসঞ্চিতি বা প্রভিশন হলো আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষাকবচ। সোনালী ছাড়া বাকি তিনটি ব্যাংকই এই সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী ঘাটতি থাকলে মুনাফা দেখানোর সুযোগ নেই, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বিশেষ ছাড়ের’ কারণে ব্যাংকগুলো লোকসান এড়িয়ে মুনাফা দেখাতে পারছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংক খাতের এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ