ট্রাম্পের চূড়ান্ত আলটিমেটামের মুখে ইরান; আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আমিরাতে ড্রোন হামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ১৮ মে, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা এক গভীর সংকটে পড়েছে। যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে রাজি হয়নি। এর পরিপ্রক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, চুক্তিতে আসতে দেরি হলে তেহরানকে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই গতকাল রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রহস্যময় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
‘সময় শেষ, আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’: ট্রাম্পের হুমকি
চুক্তির বিষয়ে ইরানের নেতৃত্ব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন:
"ইরানের জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে। তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। না হলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ!"
চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানকে ১৪ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে ইরান এর জবাব দিলেও ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, তেহরানের সেই প্রস্তাব তাঁর একদম পছন্দ হয়নি। এর পরপরই ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ফোনে কথা বলেন। সেখানে ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা এবং ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে আলোচনা হয়।
মুখোমুখি দুই পক্ষ: যুক্তরাষ্ট্রের ৫ দফা বনাম ইরানের দাবি
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ ও মেহের নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দৃশ্যমান ছাড় না দিয়েই যুদ্ধের সব সুবিধা টেবিল থেকে আদায় করতে চায়, যা আলোচনাকে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিচে দুই পক্ষের অবস্থান তুলে ধরা হলো:
| 🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫ দফা শর্ত | 🇮🇷 ইরানের পাল্টা মূল দাবিসমূহ |
| • ইরান কেবল একটিমাত্র পারমাণবিক কেন্দ্র সচল রাখতে পারবে। | • লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। |
| • সব উচ্চমাত্রাসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। | • ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। |
| • বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানের ২৫% সম্পদও এই মুহূর্তে ছাড়া হবে না। | • ভবিষ্যতে আর হামলা হবে না—আন্তর্জাতিক শক্তির এমন দৃঢ় প্রতিশ্রুতি চাই। |
| • যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না। | • বিদেশে থাকা সমস্ত ইরানি সম্পদ অবমুক্ত এবং সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। |
| • কেবল মূল আলোচনা শুরু হলেই সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। | • গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়ের অধিকার তেহরানের থাকবে। |
হরমুজ প্রণালিতে নতুন টোল নীতি ও সামরিক সতর্কবার্তা
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কার্যত বন্ধ রয়েছে। ইরান জানিয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচলের জন্য তারা নতুন টোল নীতি ও বিধিবিধান তৈরি করেছে, যা নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এর ঘোর বিরোধী।
এদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবুলফজল শেকারচি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে বলেছেন, "ইরানে আবার হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও সামরিক বাহিনী নজিরবিহীন খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।"
আলোচনা বাঁচাতে তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। এরপর ইসলামাবাদে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে প্রথম দফার বৈঠক হলেও তা সফল হয়নি। এখন আলোচনা যাতে সম্পূর্ণ ভেঙে না পড়ে, সেজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-কে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সরাসরি আলোচনা একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে। পাকিস্তান সব পক্ষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।"
শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে গত শনিবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভি দুই দিনের সফরে তেহরান পৌঁছেছেন। গতকাল তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির সঙ্গে ৯০ মিনিটের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, "ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ছড়ানো, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর দায়িত্বশীলতার কারণে ব্যর্থ হয়েছে।"
আমিরাতের পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলা
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় কেন্দ্রটির একটি জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এই হামলার পরপরই কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আলাপ চালিয়েছেন।
ভূরাজনীতির এই অস্থিতিশীল পারদ শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব ব্রেকিং নিউজ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন ‘পকেট নিউজ’-এ। পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।


0 মন্তব্যসমূহ