বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বরাদ্দ চায় সংগ্রাম পরিষদ, ঘোষণা মাসব্যাপী আন্দোলনের
নিজস্ব প্রতিনিধি | পকেট নিউজ
আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে Teesta Bachao Nodi Bachao Sangram Parishad। একই সঙ্গে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে মাসব্যাপী আন্দোলন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
আজ বুধবার সকালে রংপুর নগরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা বলেন, তিস্তা এখন শুধু একটি নদীর প্রশ্ন নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি Nazrul Islam Hokkani। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও তিস্তা এখনো অবহেলা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শিকার। খরা, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন ও অসময়ের প্লাবনে তিস্তা অববাহিকার মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে উত্তরাঞ্চল
সংগঠনটির দাবি, তিস্তার তলদেশ ভরাট হয়ে নদী এখন সমতলের কাছাকাছি চলে এসেছে। অনেক বাঁধ ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিবছর বন্যা ও ভাঙনে ফসল, ঘরবাড়ি, সড়ক ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
নেতারা বলেন, হাজার হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাবে তিস্তা তীরবর্তী এলাকার মানুষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থায়ী শ্রমবাজার ও পোশাকশিল্পে কাজের জন্য ছুটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা অববাহিকার দীর্ঘমেয়াদি সংকট এখন কেবল পরিবেশগত নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা ও নদী সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত জরুরি।
‘তিস্তা শুধু নদী নয়, খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি’
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুর অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভান্ডার। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, পেঁয়াজ, মরিচ, শাকসবজি ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের বড় অংশ উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলে।
তবে সেচসংকট, পানির অনিশ্চয়তা, নদীভাঙন ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের অভাবে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংগঠনটির মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু নদী রক্ষা নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং উত্তরাঞ্চলে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সরকারের বক্তব্যে ‘বিভ্রান্তি’
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পানিসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা Syeda Rizwana Hasan ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
সংগঠনের নেতারা আরও বলেন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তিস্তা ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসায় জনগণের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন,
“তিস্তা কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাঁচা–মরার প্রশ্ন। চীন-ভারত-আমেরিকা বুঝি না, আমরা চাই নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক।”
ছয় দফা দাবিতে জোর
সংগঠনটি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
একনেকে দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন
জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ
স্বশাসিত কর্তৃপক্ষ গঠন
কৃষিভিত্তিক শিল্প ও হিমাগার স্থাপন
নদীর বালু ও পাথর উত্তোলনে সরকারি ব্যবস্থাপনা
‘তিস্তা বন্ড’ চালুর মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণমূলক অর্থায়ন
নদী সংরক্ষণ, পুনঃখনন ও সেচব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুধু অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
মাসব্যাপী আন্দোলনের ঘোষণা
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক Shafiur Rahman জানান, দাবি আদায়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তিস্তা পাড়ের এলাকাগুলোতে গণসংযোগ ও ঈদ শুভেচ্ছা কর্মসূচি পালন করা হবে।
এ ছাড়া—
ঈদুল আজহার জামাতে বিশেষ মোনাজাত
৫ জুন রংপুরে সংহতি সমাবেশ
জুনজুড়ে ৫ জেলার ১২ উপজেলায় কর্মশালা, পথসভা, গণসমাবেশ ও মশাল মিছিলের কর্মসূচি পালন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গণ–অবস্থান কর্মসূচিতে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে Tarique Rahman ক্ষমতায় গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পাবে এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন–জীবিকার সঙ্গে জড়িত এই প্রকল্প দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি পাবে।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।


0 মন্তব্যসমূহ