গাজার ৭০ শতাংশ দখলের নির্দেশ নেতানিয়াহুর, চরম মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পকেট নিউজ
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা দখলে নেওয়ার জন্য ইসরায়েলি বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর এই ঘোষণাকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও তীব্র হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু জানান, গাজার ওপর ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে আরও বাড়ানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। এখন তাঁদের লক্ষ্য ৭০ শতাংশে পৌঁছানো।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় উপস্থিত উগ্রপন্থী ইহুদিবাদী গোষ্ঠীর সমর্থকেরা পুরো গাজা দখলের দাবি জানায়। এতে স্পষ্ট হয়েছে, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহলে গাজা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রবল চাপ রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের অভিযোগ
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। সেই চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি সেনারা ‘ইয়োলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সীমারেখায় পিছিয়ে যায়। কিন্তু হামাসের অভিযোগ, ইসরায়েল ধীরে ধীরে সেই সীমা অতিক্রম করে নতুন এলাকা দখল করছে এবং প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।
হামাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য গাজার ওপর স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এতে সংঘাত কমানোর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০ লাখ মানুষের মানবিক সংকট
আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গাজার প্রায় ৬৪ শতাংশ এলাকা ইতোমধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদি দখল আরও বাড়ানো হয়, তাহলে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি অত্যন্ত ছোট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হবেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ইতোমধ্যেই গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। নতুন করে এলাকা দখল মানে বেসামরিক মানুষের জীবন আরও অনিরাপদ হয়ে পড়া।
বাস্তবায়নে অচলাবস্থা
যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ সতর্ক করে বলেছেন, অগ্রগতি না হলে ‘ইয়োলো লাইন’ একসময় স্থায়ী সীমান্তে পরিণত হতে পারে। তাঁর মতে, এতে গাজা স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত বিমান হামলার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
হামলা ও পাল্টা অভিযোগ
ইসরায়েল দাবি করছে, হামাস নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ ও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, যা যুদ্ধবিরতির পরিপন্থী। অন্যদিকে হামাস বলছে, ইসরায়েলই প্রথম চুক্তি ভঙ্গ করেছে।
ফিলিস্তিনের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৮৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে হামাসের সামরিক শাখার নেতা ইজ্জ আল-দিন আল-হাদ্দাদ ও তাঁর উত্তরসূরিকেও পৃথক হামলায় হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় নতুন শঙ্কা
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত সবাইকে হত্যা করা হবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা অনুযায়ী হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে গাজার ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গাজা কার্যত স্থায়ী দখল ও বিভক্তির দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


0 মন্তব্যসমূহ