১৩৩ কোটি টাকার আধুনিক জবাইখানায় সাত বছরে মাত্র একটি গরু: ‘ব্যর্থতার স্মারক’ হয়ে ধুঁকছে ডিএসসিসির প্রকল্প
নিজস্ব প্রতিবেদক, পকেট নিউজ | ২৭ মে, ২০২৬
রাজধানীবাসীকে নিরাপদ ও মানসম্মত মাংস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্মাণ করেছিল দুটি অত্যাধুনিক পশু জবাইখানা। অথচ সমীক্ষা ও সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প দুটি এখন শহরের অকার্যকর স্থাপনার মূর্ত প্রতীক। প্রতিষ্ঠার সাত বছরে হাজারীবাগ জবাইখানায় গরু জবাই হয়েছে মাত্র একটি! অন্যদিকে, ধুলার আস্তরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি।
প্রকল্প দুটি একনজরে
হাজারীবাগ পশু জবাইখানা: ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ৮১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে উদ্বোধনের দিন মাত্র একটি গরু জবাইয়ের পর থেকে গত সাত বছর এটি পুরোপুরি অচল।
কাপ্তানবাজার পশু জবাইখানা: ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ৫২ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
কেন সচল হচ্ছে না?
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতে কোনো কার্যকর সমীক্ষা করা হয়নি। পশু সরবরাহ ব্যবস্থা, মাংস বিপণন ও মাংস ব্যবসায়ীদের চাহিদাকে বিবেচনায় না রেখেই ভবনগুলো তৈরি করা হয়েছে।
১. ব্যবসায়ীদের অনীহা: অলিগলিতে বা নিজ দোকানের সামনে জবাই করার অভ্যাসের কারণে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত পরিবহন খরচ ও জবাইখানার ফি দিতে আগ্রহী নন।
২. অবাস্তব ইজারামূল্য: ইজারাদারদের জন্য বছরের পর বছর উচ্চমূল্য নির্ধারণ করায় কোনো প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসছে না।
৩. পরিকল্পনাহীনতা: জবাইখানা থেকে মাংস বাজারে নেওয়ার সঠিক পরিবহন ব্যবস্থার অভাব ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি অকার্যকারিতা
পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইনের মূল লক্ষ্য ছিল অসুস্থ পশু জবাই রোধ ও মাংসের গুণমান নিশ্চিত করা। কিন্তু জবাইখানাগুলো চালু না হওয়ায় রাজধানীতে এখন স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই পশু জবাই হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত অনিরাপদ মাংস খাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকছে।
নতুন কমিটির আশ্বাস বনাম বাস্তব বাস্তবতা
ডিএসসিসি নতুন করে হাজারীবাগ জবাইখানাটি চালুর জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। তবে নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, “কাগুজে কমিটি দিয়ে এই প্রকল্প বাঁচানো সম্ভব নয়।” তাঁর মতে, বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক মডেল ও জবাবদিহি ছাড়া এই উদ্যোগও আগের মতোই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এখান থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
কারিগরি নিরীক্ষা: যন্ত্রপাতিগুলো সচল কি না তা আগে যাচাই করা।
ভর্তুকি ও পাইলট প্রকল্প: ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে শুরুতেই ফি কমানো এবং নির্দিষ্ট কিছু বাজারের ওপর বাধ্যতামূলক পাইলট প্রকল্প চালু করা।
আইন প্রয়োগ: পর্যায়ক্রমে দোকানের সামনে পশু জবাই বন্ধ করে ফিটনেস সনদ ছাড়া মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করা।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, তিনি যেভাবেই হোক জবাইখানা দুটি সচল করার উপায় খুঁজছেন। কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায়—ভুল পরিকল্পনার খেসারত দিতে দিতে ক্লান্ত নগরবাসী কবে নাগাদ এই ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল ভোগ করতে পারবেন?
নগরীর এমন আরও গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী খবর সবার আগে পেতে চোখ রাখুন ‘পকেট নিউজ’-এ।
পকেট নিউজ — হাতের মুঠোয় সকল খবর।


0 মন্তব্যসমূহ